ঊনচত্বারিংশ পর্ব
দারোয়ানদের মধ্যে একজন কিছুটা বয়স্ক। তার দরবেশের মতো সাদা লম্বা ধবধবে দাঁড়ি। লম্বা গোফও আছে। বয়স সর্বোচ্চ পঞ্চাশের মতো। কিন্তু তার দাঁড়ি গোফের অবস্থা দেখে মনে হয় সত্তর বছরের বৃদ্ধ। আর আসিফ আহমেদ যেন তার ছেলের বয়সী। তিনি তার সামনে গিয়ে বললেন, বাবাজি আপনি আগে কি কখনো এসেছিলেন?
আসিফ আহমেদ অতি সংক্ষেপে উত্তর দিলেন, না।
অফিসে গিয়েছিলেন?
না।
তাইলে আপনে আরও পরে আসেন। কোথাও ঘোরাঘুরি কইরা আসেন। ম্যাডাম ঘুমে আছেন। ঘুম থেকে না জাগা পর্যন্ত খবর দিতে পারতেছি না! বোঝেনই তো, আমাদের পক্ষে তাকে ঘুম থেকে ডেকে তোলা সম্ভব না।
আসিফ আহমেদ ঘড়ির দিকে তাকান। মনে মনে বললেন, বেলা ১০টা বাজে। এত সময় পর্যন্ত তো তার ঘুমানোর কথা না! লোকগুলো সঠিক তথ্য দিচ্ছে কি না তা কে জানে! এ মুহূর্তে আর কোথায় যাব। রোদটা একেবারেই বিরক্তিকর লাগছে। গরমে হাঁসফাঁস অবস্থা। আসিফ আহমেদ গরমে অতি দ্রুত কাবু হয়ে যান। ঠাণ্ডা সহ্য করতে পারেন। কিন্তু গরম তার খুব অসহ্য। তার পরও তাকে অপেক্ষা করা ছাড়া গতি নেই। তা না হলে তাকে চলে যেতে হবে। আবার কখন আসতে পারেন তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই।
আসিফ আহমেদ এদিক-সেদিক তাকিয়ে আবার বললেন, আপনি আরেকবার দেখবেন? আমার মনে হয় তার ঘুম ভেঙেছে। এত বেলা পর্যন্ত তো ঘুমানোর কথা না।
আরেকবার দেখতে বললেন?
হুম।
আচ্ছা দেখি। অবশ্য উনি ঘুম থেকে জাগলে আমরা খবর পেতাম। আপনি যদি ফোন করে আসতেন তাহলে ভালো হতো। আমাদের এ রকম বিব্রতকর অবস্থায় পড়তে হতো না।
হুম। ভুলই হয়েছে। তবু আরেকবার দেখেন।
দারোয়ান হেলেদুলে বাড়ির দিকে এগিয়ে যায়। এর মধ্যে বাড়ির ভেতরে ঢুকে দেখে, মোহিনীর এক সহকারী করিম বের হয়ে আসে। সে সম্ভবত বাজারে যাবে। দারোয়ান তাকে জিজ্ঞেস করল, করিম ভাই, ম্যাডাম ঘুম থেকে উঠছেন নাকি?
হ্যাঁ উঠেছেন তো! কেন কী হইছে?
এক ভদ্রলোক আইছেন। ম্যাডামের লগে দেখা করবেন। আমি তো বলছি, এখনো ঘুম ভাঙে নায়।
ভদ্রলোকের নাম?
নাম তো জানি না। জিজ্ঞেস করি নাই।
কোথায় আছেন উনি?
গেটের বাইরে।
কেন; গেটের বাইরে কেন?
অচেনা একটা লোকরে বাড়িতে কেমনে ঢুকাই!
তাও তো ঠিক। আচ্ছা আমি দেখছি।
করিম বাইরের দিকে এগিয়ে যায়। আসিফ আহমেদকে পেছন দিক থেকে দেখে গলা খাক্কারি দিয়ে বলে, আপনি কি ম্যাডামের সঙ্গে দেখা করতে আসছেন?
হ্যাঁ। উনি ঘুম থেকে উঠেছেন?
জি উঠেছেন। আপনার নাম?
আসিফ আহমেদ।
আসিফ আহমেদ! ম্যাডাম...
আমার বন্ধু।
আচ্ছা আপনি আসেন।
করিমের সঙ্গে বাড়ির ভেতরে যান আসিফ আহমেদ। ড্রয়িং রুমে তাকে বসিয়ে রেখে করিম ভেতরে যায়। মোহিনীর কাছে গিয়ে করিম বলল, ম্যাম এক ভদ্রলোক আপনার সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন। তার নাম আসিফ আহমেদ। অনেকক্ষণ আগেই এসেছেন। আপনি ঘুম থেকে ওঠেননি বলে উনি অপেক্ষায় ছিলেন।
তাই! এখন কোথায়?
আমি ড্রয়িং রুমে বসিয়েছি।
আচ্ছা, ভালো করেছিস। তুই একটা কাজ কর তো; দ্রুত নাশতা দিতে বল। আমি যাচ্ছি।
জি আমি বলছি।
করিম চলে যাওয়ার পর মোহিনী নিজেকে আয়নায় দেখে। মুখামণ্ডলে সামান্য পাউডার দেয়। এলোমেলো চুল ঠিকঠাক করে ড্রয়িং রুমের দিকে এগিয়ে যায়। ফুটবল খেলার মাঠের মতো বিশাল বড় ড্রয়িং রুমের এক কোণে বসে আসিফ আহমেদ পত্রিকায় চোখ বুলাচ্ছিলেন। আর নিজেকে নিয়ে ভাবছিলেন। তিনি কোথায় থাকেন? আর তার বান্ধবী কোথায় আছেন? মোহিনীর ড্রয়িং রুমের সমান আসিফ আহমেদের পুরো বাড়ি। শুধু নামেই সম্পাদক। সম্মান ছাড়া আর কিছু নেই। তবে এ নিয়ে তার কোনো আক্ষেপও নেই।
কিছুক্ষণের মধ্যেই মোহিনী ড্রয়িং রুমের দরজার সামনে এসে দাঁড়ালেন। বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, আসিফ তুমি!
হ্যাঁ। সারপ্রাইজ দেওয়ার জন্য আগে ফোন করিনি। সরি, আমি বোধহয় ঠিক করিনি।
ইট্স ওকে। সরি বলার কিছু নেই। তার পর, কী মনে করে?
মোহিনী আসিফ আহমেদের পাশে সোফায় বসলেন। আসিফের দিকে তাকালেন। আসিফও তার দিকে তাকিয়ে বললেন, তোমাকে দেখতে এলাম।
সত্যিই!
হুম। অন্য কোনো কারণ নেই।
যাক, খুশি হলাম। তুমি বোধহয় এই প্রথম আমার বাড়িতে এলে?
হ্যাঁ।
বাবার অফিসে দু-একবার গিয়েছিলে?
হুম। তার একটা বড় ইন্টারভিউ নিয়েছিলাম। সেটা প্রকাশের পর তিনি খুব প্রশংসা করেছিলেন।
বাবার মুখে তোমার কথা দু-একবার শুনেছি। বাবা তোমাকে খুব পছন্দ করতেন।
এত অল্প বয়সে তিনি চলে যাবেন এটা চিন্তাও করিনি। করোনা তো অনেকেরই হয়েছে। কিন্তু...
করিম ট্রলিতে করে চা-নাশতা নিয়ে এসেছে। মোহিনী দাঁড়িয়ে ট্রলি থেকে হাফ প্লেট নিয়ে লুচি আর গরুর মাংসের ভুনা তুলে দিলেন আসিফের সামনে। তিনি নিজেও নিলেন। তার পর বললেন, গরুর মাংসে অসুবিধা নেই তো? এখনো আমি লুচি দিয়ে খুব খাই।
তাই? আমারও কিন্তু খুব পছন্দ। আসিফ আহমেদ বললেন।
তোমার পত্রিকার খবর কী? কেমন চলছে?
ভালো চলছে। একটা ব্র্যান্ড ইমেজ দাঁড়িয়েছে। সবাই বেশ ভালোই বলছে। তবে বিজ্ঞাপনের অবস্থা খুব একটা ভালো না।
বিজ্ঞাপনে ভালো লোক নেই?
আছে। কিন্তু তাকে দিয়ে কতটা কী হবে বুঝতে পারছি না।
তুমি নিজে ইনভলব হও। সবাইকে বলো। নিজেকেই সবকিছু দেখতে হবে। এখন মানুষ দায়িত্ব নিয়ে কাজ করতে চায় না। এটা একটা বড় সমস্যা।
আমি তাই দেখছি।
কফি দেব নাকি চা?
কফি খাওয়া যায়।
আচ্ছা।
মোহিনী কফির জার থেকে মগে কফি ঢেলে আসিফের সামনে দিতে দিতে বললেন, চিনি দেব?
না। লাগবে না।
খুব ভালো। হোয়াইট পয়জন না খাওয়াই ভালো। এমনিতে ডায়াবেটিস নেই তো?
না।
ভালো। তার পর চায়ে চিনি বর্জন করা ভালো। অনেকে তো এক কাপ চায়ে দু-তিন চামচ চিনি খায়।
আসিফ আহমেদ ইতিবাচক মাথা নাড়লেন।
মোহিনী নিজে নিলেন রং চা। কফিতে চুমুক দিয়ে মগটা টি টেবিলের ওপর রাখলেন আসিফ। তার পর বললেন, আর বিয়ে করলে না?
দীর্ঘনিশ্বাস ছেড়ে মোহিনী বললেন, না! নতুন করে আর ভাবতে ইচ্ছা করে না। একজন ভালো সঙ্গী পেলে ভালো হতো। না পেলে তো কিছু করার নেই; তাই না!
হুম। যতই বয়স বাড়বে ততই অসহায় লাগবে।
মোহিনী প্রসঙ্গ পাল্টানোর জন্য বললেন, তোমার কোনো হেল্প লাগলে আমাকে বলো। কখনো তো কিছু বলো না।
তুমি এই যে বলেছ; এতেই আমি খুব খুশি। আর যদি সত্যিই লাগে তাহলে অবশ্যই তোমার কাছে আবার আসব। সমস্যা হয়েছে, বন্ধুদের কাছে কথা দিয়ে ফেলেছি। এখন ওদের ছাড়তেও পারছি না। আবার সবকিছু ঠিকঠাকভাবে যে হচ্ছে তাও না।
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,
পর্ব-২৭ পর্ব-২৮ পর্ব-২৯, পর্ব-৩০,পর্ব -৩১, পর্ব-৩২, পর্ব-৩৩,পর্ব-৩৪ পর্ব-৩৫ পর্ব-৩৬ পর্ব-৩৭ পর্ব-৩৮