ঢাকা ৩০ আষাঢ় ১৪৩১, রোববার, ১৪ জুলাই ২০২৪

কেমন হবে কোরবানির পশু?

প্রকাশ: ১৪ জুন ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১৪ জুন ২০২৪, ০৮:০৭ পিএম
কেমন হবে কোরবানির পশু?
কোরবানির পশু মোটাতাজা ও দেখতে সুন্দর হলে ভালো হয়। ইন্টারনেট

কোন পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে
গৃহপালিত সব ধরনের পশু তথা—ছাগল, ভেড়া, দুম্বা, গরু, মহিষ এবং উট দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ। এসব গৃহপালিত পশু ছাড়া অন্যান্য পশু (যেমন—হরিণ, বন্যগরু ইত্যাদি) দিয়ে কোরবানি করা জায়েজ নয়। তেমনিভাবে হাঁস-মুরগি বা কোনো পাখি দিয়েও কোরবানি জায়েজ নয়। যে পশু কোরবানি করা হবে, তার ওপর কোরবানিদাতার পূর্ণ মালিকানা থাকতে হবে। বন্ধকি পশু, কর্জ করা পশু বা পথে পাওয়া পশু দিয়ে কোরবানি আদায় হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২০৫)

কোরবানির পশুর বয়স কত হতে হবে
গরু ও মহিষের দুই বছর এবং উটের পাঁচ বছর পূর্ণ হলে কোরবানি করা জায়েজ। ছাগল, দুম্বা ও ভেড়া এক বছর পূর্ণ হতে হবে। দুম্বা ও ভেড়া যদি এক বছর পূর্ণ না হয়, তবে স্বাস্থ্যগতভাবে এক বছরের বাচ্চার মতো মনে হয়, তা হলে এমন দুম্বা ও ভেড়া দিয়েও কোরবানি করা জায়েজ। আবদুল্লাহ ইবনে উমর (রা.) কোরবানি এবং হজ-ওমরার পশুর ক্ষেত্রে উটের মাঝে পাঁচ বছর বয়স অতিক্রমকারী, গরু-মহিষের ক্ষেত্রে দুই বছর অতিক্রমকারী এবং বকরি ও ভেড়ার ক্ষেত্রে এক বছর অতিক্রমকারী পশুর কথা বলতেন। (মুয়াত্তায়ে মালেক, ৭৫৪)
 
রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা মুসিন্নাহ ছাড়া জবাই করো না। (মুসিন্নাহ হলো পাঁচ বছর বয়সী উট, দুই বছরের গরু ও ছাগলের ক্ষেত্রে এক বছর)। যদি সম্ভব না হয়, তা হলে ছয় মাস বয়সী ভেড়া বা দুম্বা।’ (মুসলিম, ১৯৬৩)

কোরবানির পশুর নর-মাদা হওয়ার শর্ত আছে কি
যেসব পশু কোরবানি জায়েজ, সেগুলোর নর-মাদা কোরবানি করা যায়। (ফতোয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৪৮)

খাসিকৃত পশু দিয়ে কোরবানি করা যাবে
খাসিকৃত পশু দিয়ে কোরবানি করা উত্তম। রাসুলুল্লাহ (সা.) যখন কোরবানির ইচ্ছে করতেন, তখন দুটি বড় মোটা তাজা শিং ও সুন্দর রঙবিশিষ্ট মেষ কিনতেন। (ইবনে মাজাহ, ৩১১৩)। আবু রাফে (রহ.) বর্ণনা করেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) দুটি মোটা তাজা খাসিকৃত ভেড়া কোরবানি করেছেন।’ (মুসনাদে আহমদ, ২৬৬৪৯)

গর্ভবতী পশু কোরবানি করা যাবে কি
গর্ভবতী পশু কোরবানি করা জায়েজ। তবে প্রসবের সময় আসন্ন হলে সে পশু কোরবানি করা মাকরুহ। জবাইয়ের পর যদি বাচ্চা জীবিত পাওয়া যায়, তা হলে সেটাও জবাই করতে হবে এবং কেউ চাইলে এর গোশতও খেতে পারবে। (ফতোয়ায়ে কাজিখান, ৩/৩৫০)

বন্ধ্যা ও পাগল পশু দিয়ে কোরবানি হবে
বন্ধ্যা পশুর কোরবানি জায়েজ। (রদ্দুল মুহতার, ৬/৩২৫)। হাসান (রা.) বলেন, ‘পাগল পশুর কোরবানি জায়েজ। তবে যদি এমন পাগল হয়, যে ঘাস-পানি দিলে খায় না এবং মাঠেও চরে না, তা হলে তার কোরবানি জায়েজ হবে না। (বাদায়েউস সানায়ে, ৪/২১৬)

যে পশুর জন্মগত শিং নেই বা ভাঙা
যে পশুর জন্মগত শিং নেই বা মাঝখানে ভেঙে গেছে, তা দিয়েও কোরবানি জায়েজ। আলি (রা.) বলেন, ‘একটি গাভী সাতজনের পক্ষ থেকে কোরবানি করা যায়।’ (বর্ণনাকারী বলেন) বললাম, ‘যদি গাভী বাচ্চা দেয়, তা হলে কী করব?’ বললেন, ‘বাচ্চাকেও গাভীর সঙ্গে জবাই করে দাও।’ বললাম, ‘খোঁড়া পশু!’ বললেন, ‘যদি কোরবানির স্থানে হেঁটে যেতে পারে, তা হলে কোরবানি করবে।’ বললাম, ‘শিংভাঙা পশু!’ বললেন, ‘এমন পশু দিয়ে কোরবানি করতে কোনো সমস্যা নেই। তবে আমাদেরকে রাসুলুল্লাহ (সা.) কোরবানির পশুর চোখ-কান ভালোভাবে দেখে নেওয়ার আদেশ করেছেন।’ (তিরমিজি, ১৪২৩)


লেখক: খতিব, বনানী মসজিদ আত-তাকওয়া

আশুরা কী ও কেন

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৪, ০২:১৯ পিএম
আশুরা কী ও কেন
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত আরবিতে ইয়াওমু আশুরা লেখা ছবি

আরবি প্রথম মাস মুহাররম। মুহাররম অর্থ সম্মানিত। আল্লাহতায়ালার কাছে সম্মানিত চার মাসের একটি মুহাররম। এ মাসের দশ তারিখকে ‘আশুরা’ বলা হয়। সৃষ্টির শুরু থেকেই এই দিনটি তাৎপর্যপূর্ণ। যুগে যুগে বহু স্মরণীয় ঘটনা ঘটেছে এই দিনে। প্রথম মানুষ ও নবি আদম (আ)-কে সৃষ্টি করা হয় এই দিনে। এ দিনেই তাঁকে জান্নাতে প্রবেশ করানো হয়। আবার জান্নাত থেকে পৃথিবীতে পাঠানো হয়। বহু ইতিহাস রচিত হয়েছে আশুরার দিনে। এই যেমন—ইবরাহিম (আ.)-এর জন্ম। নমরুদের অগ্নিকুণ্ড থেকে মুক্তিলাভ। প্লাবন শেষে নুহ (আ.)-এর নৌকা যুদি পাহাড়ে অবস্থান। এই আশুরাতেই মুসা (আ.) আসমানি কিতাব ‘তাওরাত’ লাভ করেন। ফেরাউন ও তার দলবল নীল দরিয়ায় ডুবে মরেছিল। (বুখারি, ৩৩৯৭, মুসলিম, ১১৩৯)।

পবিত্র আশুরার অত্যন্ত হৃদয়বিদারক ঘটনা হলো রাসুল (সা.)-এর দৌহিত্র ইমাম হুসাইন (রা)-এর কারবালায় সপরিবারে শাহাদাতবরণ। হুসাইন (রা.) মহানবি (সা.)-এর প্রিয় দৌহিত্রই ছিলেন না, তিনি ছিলেন তাঁর আদর্শের প্রতীক। আল্লাহতায়ালার রহমতে সিক্ত ও বিজয়ের রঙে রঙিন এই আশুরা মুমিনদের কাছে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এ দিনে রয়েছে বিশেষ আমল।

ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘মহানবি (সা.) যখন হিজরত করে মদিনায় পৌঁছেন, তখন তিনি দেখলেন মদিনার ইহুদি সম্প্রদায় আশুরার দিনে রোজা পালন করছে। তিনি তাদের জিজ্ঞেস করলেন, আশুরার দিনে তোমরা রোজা রেখেছ কেন? তারা উত্তর দিল, এই দিনটি অনেক বড়। এই পবিত্র দিনে মহান আল্লাহ মুসা (আ.) ও বনি ইসরাইলকে ফেরাউনের কবল থেকে রক্ষা করেছিলেন। আর ফেরাউন ও তার বাহিনীকে নীল নদে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। এর কৃতজ্ঞতাস্বরূপ মুসা (আ.) রোজা রাখতেন। তাই আমরাও আশুরার রোজা পালন করি। তাদের উত্তর শুনে নবি (সা.) বললেন, মুসা (আ.)-এর কৃতজ্ঞতার অনুসরণে আমরা তাদের চেয়ে বেশি হকদার। অতঃপর তিনি নিজে আশুরার রোজা রাখেন এবং উম্মতকে তা পালন করতে নির্দেশ প্রদান করেন।’ (বুখারি, ৩৩৯৭)


আশুরার রোজার দ্বারা বান্দার বিগত এক বছরের গুনাহ মাফ হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘আশুরার দিনের রোজার দ্বারা আমি আল্লাহর কাছে বিগত বছরের গুনাহ মাফের আশা রাখি।’ (ইবনে মাজাহ, ১৭৩৮)
দশই মুহাররম বা আশুরার দিন ইহুদিরাও রোজা রাখে। তাই নবিজি আশুরার রোজার সঙ্গে আরও একটি রোজা রাখতে বলেছেন। ইমাম শাফি ও তাঁর সাথিরা, ইমাম আহমাদ, ইমাম ইসহাক প্রমুখ বলেছেন, ‘আশুরার রোজার ক্ষেত্রে দশম ও নবম উভয় দিনের রোজাই মুস্তাহাব। কেননা রাসুলুল্লাহ (সা.) দশ তারিখ রোজা রেখেছেন এবং নয় তারিখ রোজা রাখার নিয়ত করেছেন। ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, তোমরা ৯ ও ১০ (এই দুই দিন) রোজা পালন করো এবং (এক্ষেত্রে) ইহুদিদের বিপরীত করো।’ (তিরমিজি, ৭৫৫)


অনেকে কারবালার ঘটনাকে স্মরণ করে মর্সিয়ায় ডুবে থাকে। ‘হায় হোসাইন, হায় হোসাইন’ বলে মাতম করে। নিজেকে রক্তাক্ত করে। এতে কোনো উপকার নেই; বরং গুনাহ হয়। শোকে বিলাপ করা, কাপড় ছেঁড়া, শরীর ক্ষত-বিক্ষত করা, আনুষ্ঠানিক শোক মিছিল ও শোক দিবস পালন করা ইসলামে সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ। আমাদের করণীয় হলো নফল রোজা ও নামাজের মাধ্যমে দোয়া করা। নিজের ও পুরো মুসলিম জাহানের কল্যাণ কামনা করা। (বুখারি, ১২৯৬)।

এছাড়া এ দিনের গুরুত্ব প্রকাশ করতে গিয়ে অনেক ভিত্তিহীন কথারও প্রচলন রয়েছে। যেমন—এদিন ইউসুফ (আ.) জেল থেকে মুক্তি পেয়েছেন, ইয়াকুব (আ.) চোখের জ্যোতি ফিরে পেয়েছেন, ইউনুস (আ.) মাছের পেট থেকে মুক্তি পেয়েছেন, ঈসাকে (আ.) আসমানে উঠিয়ে নেওয়া হয়। অনেকে বলে থাকেন, এদিনেই কিয়ামত সংঘটিত হবে। এসব কথার কোনো ভিত্তি নেই। (আল আসারুল মারফুয়া, ৬৪/১০০)

 

লেখক: ইমাম ও খতিব, কসবা জামে মসজিদ

শরীরে ট্যাটু আঁকার ভয়াবহ পরিণতি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৪, ০৭:১৬ পিএম
শরীরে ট্যাটু আঁকার ভয়াবহ পরিণতি
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত ট্যাটু আঁকা হাতের ছবি

বর্তমানে একশ্রেণির মানুষের কাছে দিন দিন জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে ট্যাটু আঁকা বা উল্কি অঙ্কন। অনেকে না জেনে ফ্যাশন হিসেবে শরীরে ট্যাটু আঁকে। ট্যাটু আঁকা বা উল্ক অঙ্কন সম্পর্কে ইসলামের বিস্তারিত বিধান তুলে ধরা হলো—

আল্লাহ মানুষকে সুন্দর অবয়ব দিয়ে সৃষ্টি করেছেন। আল্লাহ বলেন, ‘আমি মানুষকে সৃষ্টি করেছি সর্বোত্তম কাঠামো দিয়ে।’ (সুরা তিন, আয়াত: ৪)। তবে একশ্রেণির মানুষ এই সুন্দরকে অসুন্দর করছে। অসুন্দরের চর্চায় হারামে জড়াচ্ছে। প্রাচীনকাল থেকেই কিছু মানুষ শরীরে ট্যাটু আঁকত। রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেও এর প্রচলন ছিল। একে ইংরেজিতে ট্যাটু, বাংলায় উল্কি এবং আরবিতে ওয়াশম বলে। মানবদেহের ত্বকে সুই বা এ জাতীয় কোনো কিছু দিয়ে ক্ষত করে বাহারি রঙের নকশা করার নামই উল্কি বা ট্যাটু। ট্যাটু সাধারণত স্থায়ী হয় অথবা সহজে মুছে ফেলা যায় না। ইসলামে ট্যাটু করা হারাম। 

আবদুল্লাহ (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) এমন সব নারীর ওপর অভিসম্পাত করেছেন, যারা শরীরে উল্কি আঁকে ও অন্যকে দিয়ে উল্কি আঁকায় এবং সৌন্দর্যের জন্য ভ্রুর চুল উপড়িয়ে আল্লাহতায়ালার সৃষ্টিকে পরিবর্তন করে।’ (তিরমিজি, ২৭৮২)
ইবনে ওমর (রা.) বলেন, ‘যেসব নারী নকল চুল ব্যবহার করে, যারা অন্য নারীকে নকল চুল এনে দেয় এবং যেসব নারী উল্কি আঁকে ও যাদের জন্য করে; রাসুলুল্লাহ (সা.) তাদের অভিশাপ দিয়েছেন।’ (তিরমিজি, ১৭৫৯)


ট্যাটুতে বিভিন্ন প্রাণীর ছবি আঁকা হয়, যা গুনাহের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যারা প্রাণীর ছবি আঁকে, তাদের কেয়ামতের দিন শাস্তি দেওয়া হবে এবং তাদের বলা হবে, তোমরা যা সৃষ্টি করেছিলে তাদের আত্মা ও জীবন দাও।’ (বুখারি, ৪৭৮৩)
শরীরের মধ্যে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা আল্লাহর সৃষ্টিকে বিকৃতির নামান্তর। রাসুলুল্লাহ (সা.) ট্যাটু করতে নিষেধ করেছেন। ট্যাটুর সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সবাইকে অভিসম্পাত করেছেন। 


কৃত্রিম উপায়ে অঙ্গে বিকৃতি সাধন করা গুনাহের কাজ। অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ক্ষতি হয় এমন যেকোনো কাজই ইসলামে নিষেধ। একইভাবে ট্যাটু করতে গিয়ে পর্দার বিধান পুরোপুরি  লঙ্ঘিত হয়, যা শরিয়তের বিধান অনুযায়ী অপরাধের শামিল। যেখানে সর্বদা নারীর অঙ্গ ঢেকে রাখা আবশ্যক, সেখানে একজন নারীর অঙ্গে  ট্যাটু করে মানুষকে দেখিয়ে বেড়ানো মারাত্মক গুনাহের কাজ। এই বিধান নারী-পুরুষ উভয়ের জন্যই সমানভাবে প্রযোজ্য। 


এটি একটি অভিশপ্ত প্রথা, যা প্রাচীনকাল থেকে চলে আসছে। শরীরে ট্যাটু বা উল্কি আঁকা বেশির ভাগ ইসলামি আইন বিশেষজ্ঞের দৃষ্টিতে হারাম। তারা বলেছেন, যেসব উপায়ের মাধ্যমে আল্লাহর সৃষ্ট অঙ্গে পরিবর্তন আনা হয়, তার সবই নিষিদ্ধ। আলাদা চুল লাগানো, ভ্রু প্লাক করা, চোখে আলাদা পালক লাগানো ইত্যাদি ইসলাম অনুমোদন করে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যেসব নারী সৌন্দর্যের জন্য উল্কি অঙ্কন করে এবং যাদের জন্য করে এবং যেসব নারী ভ্রু উৎপাটন করে এবং দাঁত ফাঁকা করে, আল্লাহতায়ালা তাদের অভিসম্পাত করেছেন।’ (বুখারি, ৫৬০৪)

লেখক: শিক্ষক, মারকাজুল কোরআন মাদরাসা, শ্রীপুর

রোগী দেখার সুন্নত পদ্ধতি

প্রকাশ: ১৩ জুলাই ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ১৩ জুলাই ২০২৪, ০৯:০০ এএম
রোগী দেখার সুন্নত পদ্ধতি
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত রোগী দেখার ছবি

আত্মীয়স্বজন, পাড়া-প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীদের কেউ অসুস্থ হলে আমরা অনেকেই তাদের দেখতে যাই। খোঁজখবর নিই। এই দেখতে যাওয়া ও খোঁজখবর নেওয়ার কিছু সুন্নত পদ্ধতি রয়েছে। এখানে কয়েকটি আলোচনা করা হলো

অজু অবস্থায় যাওয়া: অজু অবস্থায় অসুস্থ ব্যক্তিকে দেখতে যাওয়া মুমিনের বৈশিষ্ট্য। এতে কল্যাণ পাওয়া যায়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে উত্তমরূপে অজু করে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কোনো অসুস্থ মুসলমান ভাইকে দেখতে যায়, তাকে জাহান্নাম থেকে ষাট বছরের পথ দূরে রাখা হবে।’ (আবু দাউদ, ৩০৯৭)

রোগীর খোঁজখবর নেওয়া: রোগীকে দেখতে গিয়ে খোঁজখবর নেওয়া সুন্নত। অবস্থা বুঝে মাথায় হাত বুলিয়ে কুশল জানা সওয়াবের কাজ। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘শুশ্রুষার পূর্ণতা হলো রোগীর কপালে বা শরীরে হাত রেখে জিজ্ঞেস করা, কেমন আছেন?’  (তিরমিজি, ৪/৩৩৪) 
রোগীর কাছে বেশিক্ষণ অবস্থান না করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোগী দেখার সময় হলো উটের দুধ দোহন পরিমাণ। আরেক বর্ণনায় এসেছে, রোগী দেখার উত্তম পন্থা হলো তাড়াতাড়ি ফিরে আসা।

রোগীকে খেতে দেওয়া: রোগী কিছু খেতে চাইলে এবং তা তার জন্য ক্ষতিকর না হলে খেতে দেওয়া। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রোগী যদি কিছু খেতে চায়, তবে তাকে খেতে দেওয়া উচিত।’ (বুখারি, ১০/১১৮)

উচ্চ আওয়াজে কথা না বলা: ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, সুন্নত হলো রোগীর পাশে কম সময় বসা এবং উঁচু আওয়াজে কথা না বলা।

দোয়া করা: রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘কোনো রোগীর কাছে গিয়ে নিচের দোয়াটি সাতবার পাঠ করলে মৃত্যুরোগ ছাড়া সব রোগ থেকে সে সুস্থ হয়ে উঠবে। দোয়াটি হলো—বাংলা উচ্চারণ: ‘আস আলুল্লাহাল আজিম, রাব্বাল আরশিল আজিম, আই ইয়াশফিয়াকা।’ বাংলা অর্থ: আমি মহান আরশের প্রভু মহামহিম আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করছি, তিনি যেন তোমাকে রোগমুক্তি দেন। (আবু দাউদ, ৩১০৬)

লেখক: মাদরাসা শিক্ষক ও প্রাবন্ধিক 

বৃষ্টি স্পর্শ করা সুন্নত

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
আপডেট: ১২ জুলাই ২০২৪, ০৭:০০ পিএম
বৃষ্টি স্পর্শ করা সুন্নত
ইন্টারনেট থেকে সংগৃহীত বৃষ্টিস্নাত একটি প্রাকৃতিক ছবি

বৃষ্টি পছন্দ করেন না এমন মানুষ খুঁজে পাওয়া মুশকিলের ব্যাপারই বটে। বৃষ্টির জন্য অনেকে প্রতীক্ষায় থাকেন। বৃষ্টির মায়াবী দিনে নানা আয়োজন করেন। মানুষের কাছে সব ঋতুর মধ্যে বর্ষা প্রিয় হওয়ার অন্যতম কারণ এই বৃষ্টি। বর্ষা এক প্রশান্তির ঋতু। প্রচণ্ড দাবদাহের পর পৃথিবী শান্তি পায় বর্ষার শান্তিবারি বর্ষণে। বর্ষার বৃষ্টি এসে ধুয়েমুছে নিয়ে যায় কতকিছু। বৃষ্টিকে ছুঁয়ে দিতে মন উতলা হয়ে ওঠে। সবুজ জলমগ্নতায় আকুল হয়ে ওঠে প্রকৃতিপ্রেমীর মন।  


বৃষ্টি আল্লাহর নেয়ামত। আয়েশা (রা.) বলেছেন, ‘আমি এ বিষয়ে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলে তিনি বলেন, ‘আমার আশঙ্কা হয়, আমার উম্মতের ওপর কোনো গজব আসে কিনা।’ বৃষ্টি দেখলেই তিনি বলতেন, ‘এটি আল্লাহর রহমত।’ (মুসলিম, ১৯৬৯)


বৃষ্টির মাধ্যমে আল্লাহতায়ালা ফসলি জমির উর্বরতা বাড়িয়ে দেন। গ্রীষ্মের তপ্ত আবহাওয়া সুশীতল করে দেন। নতুন করে প্রাণ ফিরে পায় গ্রীষ্মের খরতাপে পুড়তে থাকা প্রকৃতি। আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ আকাশ থেকে পানি বর্ষণের মাধ্যমে মৃতপ্রায় ধরিত্রীকে পুনরুজ্জীবিত করেন; তাতে যাবতীয় জীবজন্তুর বিস্তার ঘটান; তাতে বায়ুর দিক পরিবর্তনে এবং আকাশ ও পৃথিবীর মধ্যে নিয়ন্ত্রিত মেঘমালায় জ্ঞানবান জাতির জন্য নিদর্শন রয়েছে।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৬৪)


বৃষ্টির সময় দোয়া কবুল হয়। রাসুলুল্লাহ (সা.) বৃষ্টির সময় এই দোয়া পড়তেন—বাংলা উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা সাইয়িবান নাফিয়া’। বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, কল্যাণকর বৃষ্টি দাও। (বুখারি, ১০৩২)
বৃষ্টি শেষ হয়ে এলে রাসুলুল্লাহ (সা.) সাহাবিদের এই দোয়া পড়ার তাগিদ দিয়েছেন, বাংলা উচ্চারণ: ‘মুতিরনা বিফাদলিল্লাহি ওয়া রাহমাতিহ।’ বাংলা অর্থ: আল্লাহর অনুগ্রহ ও রহমতে আমাদের ওপর বৃষ্টি বর্ষিত হয়েছে।’ (বুখারি, ১০৩৮)

বৃষ্টির সুশীতল আবহাওয়ার কারণে মন প্রফুল্ল হয়ে ওঠে। অনেকেই বৃষ্টিবিলাস করতে পছন্দ করেন। কেউ কেউ শখ করে বৃষ্টিতে ভিজে গোসল করেন। অনেকে হাত বাড়িয়ে বৃষ্টির পানি স্পর্শ করে আনন্দ উপভোগ করেন। কিন্তু অনেকেরই  হয়তো জানা নেই, বৃষ্টির পানি স্পর্শ করা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সুন্নত। তিনিও বৃষ্টির পানি গায়ে লাগাতেন। 
আনাস (রা.) বলেন, ‘আমরা রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর সঙ্গে থাকাকালে একবার বৃষ্টি নামল। রাসুলুল্লাহ (সা.) তখন তাঁর পরিধেয় (কাপড়) প্রসারিত করলেন, যাতে পানি তাঁকে স্পর্শ করতে পারে। আমরা বললাম, আপনি কেন এমন করলেন? তিনি বললেন, কারণ তা তার রবের কাছ থেকে মাত্রই এসেছে।’ (মুসলিম, ৮৯৮) 


রাসুলুল্লাহ (সা.) অতিবৃষ্টির কারণে ক্ষয়ক্ষতি হতে দেখলে মহান আল্লাহর কাছে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি দোয়া করতেন, বাংলা উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা হাওয়া লাইনা ওয়া লা আলাই না’। বাংলা অর্থ : হে আল্লাহ, তুমি বৃষ্টি আমাদের আশপাশে বর্ষণ করো, আমাদের ওপরে নয়। (নাসায়ি, ১৫২৭)
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) আকাশে মেঘ দেখলে নফল ইবাদত ছেড়ে দিতেন। তিনি এই বলে দোয়া করতেন, বাংলা উচ্চারণ: ‘আল্লাহুম্মা ইন্নি আসআলুকা খাইরাহা ওয়া খাইরি ওয়া খাইরি মা উরসিলাত বিহি, ওয়া আউজুবিকা মিন শাররিহা ওয়া শাররি ওয়া শাররি মা উরসিলাত বিহি।’ বাংলা অর্থ: হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে বৃষ্টির উপকারী দিক কামনা করছি। আর অনিষ্ট থেকে আশ্রয় চাইছি।’ (আবু দাউদ, ৫১৯৯)

লেখক: শিক্ষার্থী, জামেয়া মোহাম্মাদিয়া নুরিয়া, ময়মনসিংহ

মুহাররম মাসের আমল

প্রকাশ: ১২ জুলাই ২০২৪, ০৯:০০ এএম
আপডেট: ১১ জুলাই ২০২৪, ০৩:৫০ পিএম
মুহাররম মাসের আমল
আরবি ও ইংরেজিতে মুহাররামুল হারাম লেখা ছবি

হিজরি সনের প্রথম মাস মুহাররম। কোরআনে যে চারটি মাসকে সম্মানিত বলা হয়েছে, এর মধ্যে মুহাররম অন্যতম। পবিত্র কোরআনে এরশাদ হয়েছে, ‘আকাশ ও পৃথিবী সৃষ্টির দিন থেকেই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারো, এর মধ্যে ৪টি মাস (মুহাররম, রজব, জিলকদ, জিলহজ) সম্মানিত।’ (সুরা তাওবা, আয়াত: ৩৬)


সম্মানিত মাসের কথা বলতে গিয়ে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘তিনটি মাস হলো ধারাবাহিক—জিলকদ, জিলহজ ও মুহাররম, অন্যটি হলো রজব।’ (বুখারি, ৩১৯৭)। এ মাসগুলোকে সম্মান দেখানো ও মর্যাদা দেওয়া মুমিনের নৈতিক দায়িত্ব।


মুহাররম মাস অত্যন্ত ফজিলত ও গুরুত্বপূর্ণ। রমজানের পরই এ মাসের শ্রেষ্ঠত্বের কথা হাদিসে এসেছে। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের পর সবচেয়ে সম্মানিত মাস হলো মুহাররম। আর ফরজ নামাজের পর সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ নামাজ হলো রাতের নামাজ।’ (মুসলিম, ১১৬৩)। রাসুলুল্লাহ (সা.) এ মাসকে আল্লাহর মাস বলে অভিহিত করেছেন। (নাসায়ি, ৪২১৬)

এ মাসে রাসুলুল্লাহ (সা.) থেকে বিশেষত একটি আমলে বর্ণনা পাওয়া যায় আর সেটা হলো আশুরার দিন রোজা রাখা। এখানে মুহাররম মাসের কয়েকটি আমল সম্পর্কে আলোচনা করা হলো—

নফল রোজা রাখা
আল্লাহ প্রাপ্তবয়স্ক মুসলমানের ওপর রমজানের রোজা ফরজ করেছেন। এ ছাড়া অন্যান্য মাসের রোজা নফল করা হয়েছে। রমজানের পর সর্বোত্তম রোজা হলো মুহারমম মাসের রোজা। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘রমজানের রোজার পর সর্বোত্তম রোজা হচ্ছে আল্লাহর মাস মুহাররমের রোজা।’ (মুসলিম, ২৬৪৫)
আলি (রা.) বলেন, ‘আমি রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর কাছে বসা অবস্থায় তাঁকে এক ব্যক্তি প্রশ্ন করল, হে আল্লাহর রাসুল, রমজানের পর কোন মাসে আপনি আমাকে রোজা রাখার নির্দেশ দেবেন? রাসুলুল্লাহ (সা.) বললেন, যদি তুমি রমজানের পর রোজা রাখতে চাও, তাহলে মুহাররম মাসে রাখো। কারণ মুহাররম আল্লাহর মাস।’ (তিরমিজি, ৭৪১)
উম্মুল মুমিনিন হাফসা (রা.) বলেন, ‘রাসুলুল্লাহ (সা.) চারটি কাজ কখনো পরিত্যাগ করেননি। আশুরার রোজা, জিলহজের প্রথম দশকের রোজা, আইয়ামে বিদের (প্রতি মাসের ১৩, ১৪ ও ১৫ তারিখ) রোজা, ফজর ওয়াক্তে ফরজের আগে দুই রাকাত সুন্নত নামাজ।’

তওবা-ইতসিগফার করা
এ মাসে ইসলামের অনেক গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটেছে। এ মাসে বিশেষ এক সময় আছে, যে সময়ের দোয়া আল্লাহ কবুল করেন। এক সাহাবির প্রশ্নে রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘…মুহাররম আল্লাহর মাস। আর এ মাসে এমন একটি দিন আছে, যে দিনে আল্লাহতায়ালা একটি জাতির তওবা কবুল করেছেন এবং ভবিষ্যতেও অন্যান্য জাতির তওবা কবুল করবেন।’ (তিরমিজি, ৭৪১)

গুনাহ বর্জন করা
ইসলামে অন্যের ওপর জুলুম করা নিষেধ। বিশেষ করে সম্মানিত মাস মুহাররমে জুলুম করার তো প্রশ্নই আসে না। গুনাহ করা হলো সবচেয়ে বড় জুলুম। এটি ছেড়ে দিতে হবে। আল্লাহতায়ালা বলেন, ‘এই চার মাসের মধ্যে তোমরা (গুনাহ করে) নিজেদের প্রতি জুলুম করো না।’ (সুরা তাওবা, আয়াত : ৩৬)। পাশাপাশি বিধর্মীদের অনুসরণ-অনুকরণ ত্যাগ করতে হবে। কোনো ধরনের অন্যায়ের সঙ্গে জড়িত হওয়া যাবে না। রাসুলুল্লাহ (সা.) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য অবলম্বন করে, কিয়ামতের দিন সে ওই জাতির দলভুক্ত হবে। অর্থাৎ ওই দল জান্নাতবাসী হলে সে-ও জান্নাতবাসী হবে। আর ওই দল জাহান্নামবাসী হলে সে-ও জাহান্নামবাসী হবে।’ (আবু দাউদ, ৪০৩১)

লেখক: আলেম, গবেষক ও সাংবাদিক