ত্রিচত্বারিংশ পর্ব
রহিমাবিবি একটা চিঠি নিয়ে হনহন করে মোহিনীর রুমের দিকে ছুটে যায়। তার রুমের কাছাকাছি গিয়ে আপামণি আপামণি বলে ডাকতে থাকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে মোহিনীকে উদ্দেশ করে বলে, আপামণি! আপামণি! আসতে পারি?
রহিমাবিবির ডাক শুনে মোহিনী দরজার দিকে এগিয়ে যান। রহিমাবিবির কণ্ঠস্বরটা আজ একটু অন্যরকম। রহস্যময় বলে মনে হলো মোহিনীর। তিনি এ ধরনের বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন, কি রে রহিমা! কী হয়েছে! কোনো সমস্যা?
আপনের একটা চিঠি; ড্রাইভার দিয়া গেল।
মোহিনী বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, চিঠি! কীসের চিঠি? কে পাঠিয়েছে?
আমি কী জানি? আমি কি পড়তে পারি? এই দেহেন।
মোহিনী চিঠি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখেন। খামের ওপরে শুধু মোহিনী আহমেদ লেখা। মনে মনে বললেন, কে দিল এই চিঠি?
রহিমাবিবি ঠায় দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। সে মোহিনীর কাছে চলে যাওয়ার অনুমতি চাইল। মোহিনী ইশারায় তাকে যেতে বলে চিঠিটা খুললেন। শুরুটা না পড়েই নিচের দিকে তাকালেন। ইতি তোমার শ্বশুর লেখা দেখে আবার শুরু থেকে পড়তে শুরু করলেন।
মোহিনী মা আমার!
আশা করি আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় ভালোই আছ। তোমার কোনো খোঁজখবর না পেয়ে আমি নিজেই ঢাকায় চলে এলাম। আমি তো তোমার বাসা চিনি না! তাই অফিসে এসেছিলাম। অফিসে এসে তোমার খোঁজ নিলাম। আমাকে তারা বলল, তুমি বাসায় চলে গেছ। তুমি ভালো আছ তো মা? তোমাকে এই চিঠি লিখলাম বলে কিছু মনে করো না। আসলে আমি তো লেখাপড়া কিছু জানি না! তাই তোমার অফিসের একজনকে দিয়ে এই চিঠিটা লেখালাম।
মা, তোমার টাকা দিয়েই মূলত আমাদের সংসারটা চলত। কিন্তু বিগত দুই তিন মাস ধরে তোমার কোনো টাকা পাই নাই। আমি জানি না কেন টাকা বন্ধ হয়েছে। ভাবলাম, তোমার কোনো সমস্যা হলো কি না? তাই তোমার কাছে ছুটে এসেছি মা। ঢাকায় এসে জানতে পারলাম, আমার বেয়াইন সাহেবা ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই খবর শুনে খুব কষ্ট পাইছি মা। তাকে তো কখনো দেখার সুযোগ পাইনি! আরেফিন বেয়াই সাহেব ও বেয়াইন সাহেবার কথা খুব বলত। আমি তাদের মন থেকে দোয়া করি মা। তাদের আল্লাহ বেহেশত নসিব করুন।
মাগো, খবরটা শুনে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। তোমার শাশুড়িও খুব অসুস্থ। আমার অবস্থাও খুব একটা ভালো না। মাগো, একটা কথা তোমাকে না বললেই নয়। আমরা ছেলেমেয়ে নিয়া বড় কষ্টে আছি। টাকার অভাবে তোমার শাশুড়ির চিকিৎসা করাতে পারছি না। সংসারই চলে না! চিকিৎসা করাব কী দিয়া? তুমি টাকা না দিলে যে আমাদের ঘরে আর চুলাও জ্বলবে না মা! তুমি কি কোনো কারণে আমাদের ওপর রাগ করেছ? আমরা কি কোনো ভুল করেছি? যদি ভুল করে থাকি তাহলে ক্ষমা করে দিও মা। আমি তো তোমার বাবার মতোই! শ্বশুর আর বাবার মধ্যে কতটুকুই বা পার্থক্য! আমাদের ওপর যদি কোনো রাগ থাকে তাহলে তা মনে রেখ না। তোমার জন্য আমরা প্রাণখুলে দোয়া করি।
ঢাকা শহরে আমার কোনো থাকার জায়গাও নাই। তাই আজকে সন্ধ্যায় বাড়ি চলে যাচ্ছি। তোমার জন্য অনেক অনেক দোয়া করি। ভালো থেকো সব সময়।
ইতি
তোমার শ্বশুর
আলী আকবর
চিঠি পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মোহিনী। তিনি অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছেন। চোখের পানি মুছে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। তার পর চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। চেয়ার টেনে বসলেন। তার মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। তিনি মনে মনে বলেন, কয়েক মাস টাকা পাননি! কেন পাননি? কেন টাকা পাঠানো হয়নি? আমি তো টাকা পাঠাতে বারণ করিনি! তাহলে কে করল কাজটা? কার এতবড় সাহস? বিস্ময়কর ব্যাপার তো! তাহলে কি প্রশাসন থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে? কিন্তু তারা কেন করবে?
মোহিনী দেরি না করে তখনই নিজের মোবাইল থেকে প্রশাসন বিভাগের জি এম আবুল কালামকে ফোন করলেন। কোনো ভণিতা ছাড়াই বললেন, কালাম সাহেব! আরেফিনের বাবার নামে আমরা যে টাকা পাঠাতাম সেটা কি পাঠানো হয়েছে?
না মানে ম্যাম...
আবুল কালাম কথা শেষ করতে পারেননি। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন মোহিনী। কে বন্ধ করতে বলেছে? আমাকে কেন তা জানানো হয়নি? কয় মাস পাঠানো হয়নি? কেন পাঠানো হয়নি তা এখনই আমাকে জানান। সবকিছু নিয়ে বাসায় আসেন।
মোহিনী ফোন রেখে দিলেন। আবুল কালাম থরথর করে কাঁপছেন। তার প্রেসার বেড়ে এক শ আর এক শ চল্লিশে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কী জবাব দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। তিনি রীতিমতো ঘামছেন। তার মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। কিন্তু ফ্যানের বাতাস গায়ে লাগছে না। কিছুক্ষণ পরপর তিনি কপালের ঘাম মুছছেন। মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছেন। এতে নাকি অস্থিরতা কমে। অশান্ত মন শান্ত হয়। আসন্ন বিপদ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়।
মোহিনীর ড্রয়িং রুমে আবুল কালাম বসে আছেন। তাকে চা-নাশতা দেওয়া হয়েছে। তিনি কিছুই খাচ্ছেন না। ভয়ে তিনি কাঁপছেন। মনে মনে ভাবেন, আজই বুঝি আমার চাকরি নট! আবার এও ভাবেন, চাকরি নট করলে তো আর বাসায় ডাকতেন না? নিশ্চয়ই আমাকে এবারের জন্য ক্ষমা করে দেবেন। ভুলটা আমারই। কেন যে আলী আকবর সাহেবকে টাকা পাঠানোর কথা ভুলে গেলাম! প্রতি মাসে মনে করে তার বাড়ির ঠিকানায় টাকা পাঠাতাম। অথচ টানা চার মাস কোনো টাকা পাঠাইনি! এজন্য আমার অবশ্যই শাস্তি পাওয়া উচিত। তিনি নিজের কান নিজেই মলে দিলেন। আর মনে মনে বললেন, আবুল কালাম তুমি এ ধরনের ভুল আর কখনো করবে? এর পরও কি তোমার শিক্ষা হবে না?
মোহিনী কখন ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়িয়েছে তা তিনি খেয়াল করেননি। তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে আছেন। মোহিনীর কণ্ঠস্বর শুনে তিনি থতমত খেয়ে যান। মোহিনী তাকে কিছু বলেছেন কি না তা খেয়ালও করেননি। তিনি শুধু বললেন, ম্যাম ভুল হয়ে গেছে। আমি সরি। আই অ্যাম ভেরি সরি। আর এ রকম ভুল হবে না। আর একবারও যদি কোনো ভুল করি তাহলে আমার চাকরি নট করে দিয়েন। এবারের জন্য ক্ষমা চাই ম্যাম। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করবেন।
মোহিনী তার কথাগুলো শুনলেও না শোনার ভান করে বললেন, আপনি এটা কী করলেন বলেন? আপনি জানেন, এই টাকা দিয়ে একটা পরিবার চলে। সেই পরিবারে যদি চার মাস টাকা না যায় তাহলে তাদের কী অবস্থা হতে পারে? আপনি যদি চার মাস বেতন না পেতেন তাহলে কী হতো? আপনাদের কি কাণ্ডজ্ঞান কোনো কালেই হবে না?
আবুল কালাম কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে মোহিনী বললেন, আমি আপনার কোনো কথাই শুনতে চাই না। যা করেছেন তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ভুল মানুষের হতেই পারে। কিন্তু এটা কী ধরনের ভুল? আমি এটা কিছুতেই ভুল মনে করছি না। আপনি ইনটেনশনালি এটা করেছেন। এজন্য আপনাকে শাস্তি পেতেই হবে। আপনি নিজেই বলেন আপনার কী শাস্তি হওয়া উচিত?
যে মানুষ কোনো দিন রাগেনি তার রাগ উঠলে কী অবস্থা হয় তা আজ দেখতে পাচ্ছেন আবুল কালাম। মোহিনীর দিকে তিনি তাকাতে পারছেন না। চাকরি হারানোর ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কথাও বের হচ্ছে না। তিনি দেখলেন, তার সামনে টি-টেবিলের ওপর পানির গ্লাস। গ্লাস হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলেন। তার পর বললেন, ম্যাম আমারও চার মাসের বেতন কেটে দিন!
ঠিক আছে। শাস্তির কথা যেন মনে থাকে। আপনি আজই আলী আকবর সাহেবের নামে চার মাসে যা পাঠাতেন সেই টাকার সঙ্গে আরও চার মাস যোগ করে যা হয় পাঠিয়ে দিন। আর তার কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা চিঠি লিখবেন। যদি তিনি ক্ষমা করেন তাহলে তো বাঁচলেন! অন্যথায় আপনার কপালে কী ঘটবে তা আল্লাহ মাবুদ জানেন।
আবুল কালাম দাঁড়িয়ে মোহিনীকে সালাম করে বের হয়ে গেলেন। মোহিনীর রাগ তখনো তালুতে। আবুল কালামকে কষিয়ে একটা চড় দিতে পারলে হয়তো তার রাগ কমত। কিন্তু তা কী আর সম্ভব? তিনি কেবল ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আবুল কালামের দিকে তাকিয়ে রইলেন।
শাহবাজ খানের বিদেশযাত্রা আটকে দিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। তিনি হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ দিয়ে বের হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বেরসিক ইমিগ্রেশন তাতে বাধ সাধল। থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমানে তার লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল। ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর পুলিশ কর্মকর্তা ভালো করে দেখলেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিলেন। টেলিফোনে কারও সঙ্গে কথা বললেন। ফোন রেখে পাশের একজনের সঙ্গে কানে কানে কথা বললেন। তার পর সিনিয়র একজনের দিকে এগিয়ে গেলেন। তার হাতে ওয়াকিটকি। মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন নির্দেশনাসূচক কথাবার্তা ভেসে আসছে। ওয়াকিটকির আওয়াজ কানে এলেও কথাগুলো অন্যদের বোঝার উপায় নেই। তার হাতে ওয়াকিটকি তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন।
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তার সিনিয়রের কাছে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। তারা উভয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে আরও কী সব পরামর্শ করলেন। পরে সিনিয়র কর্মকর্তা তার ওয়াকিটকিতে কারও সঙ্গে কথা বললেন। ওয়াকিটকিতে পাওয়া নির্দেশনা তিনি জুনিয়র কর্মকর্তাকে বুঝিয়ে দিলেন। জুনিয়র কর্মকর্তা নিজের চেয়ারে ফিরে এসে পাসপোর্ট হাতে নিয়ে আবার ভালো করে দেখলেন। এতক্ষণে শাহবাজ খানের মেজাজ চরমে উঠেছে। তিনি অনেক কষ্টে ধৈর্য ধরে আছেন। কিন্তু তার চেহারায় রাগের ভাব ফুটে উঠেছে। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তাকে দেখে আঁচ করতে অসুবিধা হয়নি তার। তিনি শাহবাজ খানের উদ্দেশে বললেন, এক্সকিউজ মি!
শাহবাজ খান ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তিনি নিজে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন। এতে কিছুটা সময় নিতে হলো তার। তিনি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার দিকে তাকাতেই তার হাতে পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে বলল, সরি; আজ আপনার যাওয়া হবে না।
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,
পর্ব-২৭ পর্ব-২৮ পর্ব-২৯, পর্ব-৩০,পর্ব -৩১, পর্ব-৩২, পর্ব-৩৩,পর্ব-৩৪, পর্ব-৩৫, পর্ব-৩৬, পর্ব-৩৭, পর্ব-৩৮, পর্ব-৩৯, পর্ব-৪০, পর্ব-৪১, পর্ব-৪২