ঢাকা ৭ আষাঢ় ১৪৩৩, রোববার, ২১ জুন ২০২৬

সর্বশেষ
ডিজিটাল রূপান্তরের ভবিষ্যৎ নিয়ে ঢাকায় ১২তম ডিজিটাল সামিট অনুষ্ঠিত আমরা শুধু কেপ ভার্দে নই, পুরো আফ্রিকার জন্য খেলছি: বুবিস্তা বলিভিয়ায় জরুরি অবস্থা ঘোষণা দোকানের তালা ভেঙে ১ হাজার ৪৪০ ক্যান বাংলাদেশি বিয়ার জব্দ আজ বিশ্ব সংগীত দিবস সৃজনশীল অর্থনীতি: বাংলাদেশের নতুন প্রবৃদ্ধির সম্ভাবনা ইতিহাসের পাতায় তিউনিসিয়া-জাপান ম্যাচ: ফুটবল বিশ্বকাপের ১০০০তম লড়াই ঢাকাসহ ১৫ জেলায় ৬০ কিমি বেগে বজ্রবৃষ্টির শঙ্কা উত্তরের ৪ জেলায় বন্যার শঙ্কা, আগামী ৭২ ঘণ্টায় বাড়তে পারে নদ-নদীর পানি আরেকটি বিপ্লবের জন্য প্রস্তুতি নিতে হবে : ডা. শফিকুর রহমান স্পেনের ঘুরে দাঁড়ানোর চ্যালেঞ্জ দেয়াল হয়ে দাঁড়ালেন এলোয় রুম: কুরাসাও গোলরক্ষকের বিশ্বরেকর্ড ঢাকার বাতাস আজ ‘সহনীয়’, দূষণের শীর্ষে জাকার্তা টাকার অভাবে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি অনিশ্চিত উখ্যাইংওয়ংয়ের সাম্বা সাম্বা সাম্বা, ফিরে এল সাম্বা নৃত্য ২১ জুন: তুলা, বৃশ্চিক, ধনু, মকর, কুম্ভ ও মীনের আজকের রাশিফল ড্রাগন-মাল্টার বাগান গড়ে সফল প্রবাসফেরত সাদেক ২১ জুন: মেষ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ ও কন্যার আজকের রাশিফল ন্যায়বিচারের অপেক্ষায় কারাবন্দি এক ম্যাজিস্ট্রেট যশোরে জাপার ২৫ নেতার পদত্যাগ বগুড়ার প্রত্নতাত্ত্বিক এলাকায় অবকাঠামো নির্মাণ রবিবার বন্ধ থাকবে রাজধানীর যেসব মার্কেট নারায়ণগঞ্জের হাসপাতালে নেই জলাতঙ্কের টিকা ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ দাবি শতাধিক লেবার এমপি-মন্ত্রীর ইসলামী ব্যাংক দখলের চেষ্টা হলে সরকারবিরোধী আন্দোলন হবে: জামায়াত নেতা নুরুল ইসলাম যুক্তরাষ্ট্র-ইতালি উত্তেজনা ট্রাম্পের মন্তব্যে চটেছেন মেলোনি প্লেগের জীবাণু আবিষ্কার ইকুয়েডরকে রুখে দিয়ে বিশ্বকাপ ফুটবলে প্রথম পয়েন্ট অর্জন করল কুরাসাও এক যুগ পেরোলেও চূড়ান্ত নিষ্পত্তি হয়নি আয়াজ হত্যা মামলা আওয়ামী লীগ কার্যালয় চাঁদাবাজদের আস্তানা!

ধারাবাহিক উপন্যাস মোহিনী

প্রকাশ: ১৬ জানুয়ারি ২০২৬, ১০:৫৯ এএম
মোহিনী

ত্রিচত্বারিংশ পর্ব

রহিমাবিবি একটা চিঠি নিয়ে হনহন করে মোহিনীর রুমের দিকে ছুটে যায়। তার রুমের কাছাকাছি গিয়ে আপামণি আপামণি বলে ডাকতে থাকে। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সে মোহিনীকে উদ্দেশ করে বলে, আপামণি! আপামণি! আসতে পারি?
রহিমাবিবির ডাক শুনে মোহিনী দরজার দিকে এগিয়ে যান। রহিমাবিবির কণ্ঠস্বরটা আজ একটু অন্যরকম। রহস্যময় বলে মনে হলো মোহিনীর। তিনি এ ধরনের বিস্ময়ভরা কণ্ঠে বললেন, কি রে রহিমা! কী হয়েছে! কোনো সমস্যা? 
আপনের একটা চিঠি; ড্রাইভার দিয়া গেল।
মোহিনী বিস্ময়ের সঙ্গে বললেন, চিঠি! কীসের চিঠি? কে পাঠিয়েছে?
আমি কী জানি? আমি কি পড়তে পারি? এই দেহেন। 
মোহিনী চিঠি হাতে নিয়ে উল্টেপাল্টে দেখেন। খামের ওপরে শুধু মোহিনী আহমেদ লেখা। মনে মনে বললেন, কে দিল এই চিঠি?  
রহিমাবিবি ঠায় দাঁড়িয়েছিল এতক্ষণ। সে মোহিনীর কাছে চলে যাওয়ার অনুমতি চাইল। মোহিনী ইশারায় তাকে যেতে বলে চিঠিটা খুললেন। শুরুটা না পড়েই নিচের দিকে তাকালেন। ইতি তোমার শ্বশুর লেখা দেখে আবার শুরু থেকে পড়তে শুরু করলেন। 

মোহিনী মা আমার! 
আশা করি আল্লাহতায়ালার ইচ্ছায় ভালোই আছ। তোমার কোনো খোঁজখবর না পেয়ে আমি নিজেই ঢাকায় চলে এলাম। আমি তো তোমার বাসা চিনি না! তাই অফিসে এসেছিলাম। অফিসে এসে তোমার খোঁজ নিলাম। আমাকে তারা বলল, তুমি বাসায় চলে গেছ। তুমি ভালো আছ তো মা? তোমাকে এই চিঠি লিখলাম বলে কিছু মনে করো না। আসলে আমি তো লেখাপড়া কিছু জানি না! তাই তোমার অফিসের একজনকে দিয়ে এই চিঠিটা লেখালাম। 
মা, তোমার টাকা দিয়েই মূলত আমাদের সংসারটা চলত। কিন্তু বিগত দুই তিন মাস ধরে তোমার কোনো টাকা পাই নাই। আমি জানি না কেন টাকা বন্ধ হয়েছে। ভাবলাম, তোমার কোনো সমস্যা হলো কি না? তাই তোমার কাছে ছুটে এসেছি মা। ঢাকায় এসে জানতে পারলাম, আমার বেয়াইন সাহেবা ইন্তেকাল করেছেন। ইন্নালিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিউন। এই খবর শুনে খুব কষ্ট পাইছি মা। তাকে তো কখনো দেখার সুযোগ পাইনি! আরেফিন বেয়াই সাহেব ও বেয়াইন সাহেবার কথা খুব বলত। আমি তাদের মন থেকে দোয়া করি মা। তাদের আল্লাহ বেহেশত নসিব করুন।   
মাগো, খবরটা শুনে আমি চোখের পানি ধরে রাখতে পারি নাই। তোমার শাশুড়িও খুব অসুস্থ। আমার অবস্থাও খুব একটা ভালো না। মাগো, একটা কথা তোমাকে না বললেই নয়। আমরা ছেলেমেয়ে নিয়া বড় কষ্টে আছি। টাকার অভাবে তোমার শাশুড়ির চিকিৎসা করাতে পারছি না। সংসারই চলে না! চিকিৎসা করাব কী দিয়া? তুমি টাকা না দিলে যে আমাদের ঘরে আর চুলাও জ্বলবে না মা! তুমি কি কোনো কারণে আমাদের ওপর রাগ করেছ? আমরা কি কোনো ভুল করেছি? যদি ভুল করে থাকি তাহলে ক্ষমা করে দিও মা। আমি তো তোমার বাবার মতোই! শ্বশুর আর বাবার মধ্যে কতটুকুই বা পার্থক্য! আমাদের ওপর যদি কোনো রাগ থাকে তাহলে তা মনে রেখ না। তোমার জন্য আমরা প্রাণখুলে দোয়া করি। 
ঢাকা শহরে আমার কোনো থাকার জায়গাও নাই। তাই আজকে সন্ধ্যায় বাড়ি চলে যাচ্ছি। তোমার জন্য অনেক অনেক দোয়া করি। ভালো থেকো সব সময়।  
ইতি 
তোমার শ্বশুর 
আলী আকবর

চিঠি পড়ে চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি মোহিনী। তিনি অনেকক্ষণ ধরে কেঁদেছেন। চোখের পানি মুছে কিছুক্ষণ ঠায় দাঁড়িয়েছিলেন। তার পর চিঠিটা ভাঁজ করে টেবিলের ওপর রাখলেন। চেয়ার টেনে বসলেন। তার মনের মধ্যে নানা প্রশ্ন ঘুরপাক খায়। তিনি মনে মনে বলেন, কয়েক মাস টাকা পাননি! কেন পাননি? কেন টাকা পাঠানো হয়নি? আমি তো টাকা পাঠাতে বারণ করিনি! তাহলে কে করল কাজটা? কার এতবড় সাহস? বিস্ময়কর ব্যাপার তো! তাহলে কি প্রশাসন থেকে টাকা পাঠানো বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে? কিন্তু তারা কেন করবে? 
মোহিনী দেরি না করে তখনই নিজের মোবাইল থেকে প্রশাসন বিভাগের জি এম আবুল কালামকে ফোন করলেন। কোনো ভণিতা ছাড়াই বললেন, কালাম সাহেব! আরেফিনের বাবার নামে আমরা যে টাকা পাঠাতাম সেটা কি পাঠানো হয়েছে?
না মানে ম্যাম...
আবুল কালাম কথা শেষ করতে পারেননি। তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলেন মোহিনী। কে বন্ধ করতে বলেছে? আমাকে কেন তা জানানো হয়নি? কয় মাস পাঠানো হয়নি? কেন পাঠানো হয়নি তা এখনই আমাকে জানান। সবকিছু নিয়ে বাসায় আসেন। 
মোহিনী ফোন রেখে দিলেন। আবুল কালাম থরথর করে কাঁপছেন। তার প্রেসার বেড়ে এক শ আর এক শ চল্লিশে দাঁড়িয়ে আছে। তিনি কী জবাব দেবেন তা ভেবে পাচ্ছেন না। তিনি রীতিমতো ঘামছেন। তার মাথার ওপর ফ্যান ঘুরছে। কিন্তু ফ্যানের বাতাস গায়ে লাগছে না। কিছুক্ষণ পরপর তিনি কপালের ঘাম মুছছেন। মনে মনে আয়াতুল কুরসি পড়ছেন। এতে নাকি অস্থিরতা কমে। অশান্ত মন শান্ত হয়। আসন্ন বিপদ থেকেও মুক্তি পাওয়া যায়। 

মোহিনীর ড্রয়িং রুমে আবুল কালাম বসে আছেন। তাকে চা-নাশতা দেওয়া হয়েছে। তিনি কিছুই খাচ্ছেন না। ভয়ে তিনি কাঁপছেন। মনে মনে ভাবেন, আজই বুঝি আমার চাকরি নট! আবার এও ভাবেন, চাকরি নট করলে তো আর বাসায় ডাকতেন না? নিশ্চয়ই আমাকে এবারের জন্য ক্ষমা করে দেবেন। ভুলটা আমারই। কেন যে আলী আকবর সাহেবকে টাকা পাঠানোর কথা ভুলে গেলাম! প্রতি মাসে মনে করে তার বাড়ির ঠিকানায় টাকা পাঠাতাম। অথচ টানা চার মাস কোনো টাকা পাঠাইনি! এজন্য আমার অবশ্যই শাস্তি পাওয়া উচিত। তিনি নিজের কান নিজেই মলে দিলেন। আর মনে মনে বললেন, আবুল কালাম তুমি এ ধরনের ভুল আর কখনো করবে? এর পরও কি তোমার শিক্ষা হবে না? 
মোহিনী কখন ড্রয়িং রুমে এসে দাঁড়িয়েছে তা তিনি খেয়াল করেননি। তিনি গভীর ভাবনায় ডুবে আছেন। মোহিনীর কণ্ঠস্বর শুনে তিনি থতমত খেয়ে যান। মোহিনী তাকে কিছু বলেছেন কি না তা খেয়ালও করেননি। তিনি শুধু বললেন, ম্যাম ভুল হয়ে গেছে। আমি সরি। আই অ্যাম ভেরি সরি। আর এ রকম ভুল হবে না। আর একবারও যদি কোনো ভুল করি তাহলে আমার চাকরি নট করে দিয়েন। এবারের জন্য ক্ষমা চাই ম্যাম। প্লিজ আমাকে ক্ষমা করবেন। 
মোহিনী তার কথাগুলো শুনলেও না শোনার ভান করে বললেন, আপনি এটা কী করলেন বলেন? আপনি জানেন, এই টাকা দিয়ে একটা পরিবার চলে। সেই পরিবারে যদি চার মাস টাকা না যায় তাহলে তাদের কী অবস্থা হতে পারে? আপনি যদি চার মাস বেতন না পেতেন তাহলে কী হতো? আপনাদের কি কাণ্ডজ্ঞান কোনো কালেই হবে না?
আবুল কালাম কিছু একটা বলতে চেয়েছিলেন। তাকে থামিয়ে দিয়ে মোহিনী বললেন, আমি আপনার কোনো কথাই শুনতে চাই না। যা করেছেন তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। ভুল মানুষের হতেই পারে। কিন্তু এটা কী ধরনের ভুল? আমি এটা কিছুতেই ভুল মনে করছি না। আপনি ইনটেনশনালি এটা করেছেন। এজন্য আপনাকে শাস্তি পেতেই হবে। আপনি নিজেই বলেন আপনার কী শাস্তি হওয়া উচিত?
যে মানুষ কোনো দিন রাগেনি তার রাগ উঠলে কী অবস্থা হয় তা আজ দেখতে পাচ্ছেন আবুল কালাম।  মোহিনীর দিকে তিনি তাকাতে পারছেন না। চাকরি হারানোর ভয়ে তার গলা শুকিয়ে গেছে। মুখ দিয়ে কথাও বের হচ্ছে না। তিনি দেখলেন, তার সামনে টি-টেবিলের ওপর পানির গ্লাস। গ্লাস হাতে নিয়ে কয়েক ঢোক পানি খেয়ে গলাটা ভিজিয়ে নিলেন। তার পর বললেন, ম্যাম আমারও চার মাসের বেতন কেটে দিন!
ঠিক আছে। শাস্তির কথা যেন মনে থাকে। আপনি আজই আলী আকবর সাহেবের নামে চার মাসে যা পাঠাতেন সেই টাকার সঙ্গে আরও চার মাস যোগ করে যা হয় পাঠিয়ে দিন। আর তার কাছে ক্ষমা চেয়ে একটা চিঠি লিখবেন। যদি তিনি ক্ষমা করেন তাহলে তো বাঁচলেন! অন্যথায় আপনার কপালে কী ঘটবে তা আল্লাহ মাবুদ জানেন। 
আবুল কালাম দাঁড়িয়ে মোহিনীকে সালাম করে বের হয়ে গেলেন। মোহিনীর রাগ তখনো তালুতে। আবুল কালামকে কষিয়ে একটা চড় দিতে পারলে হয়তো তার রাগ কমত। কিন্তু তা কী আর সম্ভব? তিনি কেবল ক্রুদ্ধ দৃষ্টিতে আবুল কালামের দিকে তাকিয়ে রইলেন।  

শাহবাজ খানের বিদেশযাত্রা আটকে দিয়েছে ইমিগ্রেশন পুলিশ। তিনি হজরত শাহজালাল বিমানবন্দরের ভিআইপি লাউঞ্জ দিয়ে বের হতে চেয়েছিলেন। কিন্তু বেরসিক ইমিগ্রেশন তাতে বাধ সাধল। থাই এয়ারওয়েজের একটি বিমানে তার লন্ডনে যাওয়ার কথা ছিল। ইমিগ্রেশনে পাসপোর্ট জমা দেওয়ার পর পুলিশ কর্মকর্তা ভালো করে দেখলেন। বেশ কিছুক্ষণ সময় নিলেন। টেলিফোনে কারও সঙ্গে কথা বললেন। ফোন রেখে পাশের একজনের সঙ্গে কানে কানে কথা বললেন। তার পর সিনিয়র একজনের দিকে এগিয়ে গেলেন। তার হাতে ওয়াকিটকি। মাঝে-মধ্যে বিভিন্ন নির্দেশনাসূচক কথাবার্তা ভেসে আসছে। ওয়াকিটকির আওয়াজ কানে এলেও কথাগুলো অন্যদের বোঝার উপায় নেই। তার হাতে ওয়াকিটকি তিনি হয়তো বুঝতে পারছেন। 
ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা তার সিনিয়রের কাছে এগিয়ে গিয়ে ফিসফিস করে কী যেন বললেন। তারা উভয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে আরও কী সব পরামর্শ করলেন। পরে সিনিয়র কর্মকর্তা তার ওয়াকিটকিতে কারও সঙ্গে কথা বললেন। ওয়াকিটকিতে পাওয়া নির্দেশনা তিনি জুনিয়র কর্মকর্তাকে বুঝিয়ে দিলেন। জুনিয়র কর্মকর্তা নিজের চেয়ারে ফিরে এসে পাসপোর্ট হাতে নিয়ে আবার ভালো করে দেখলেন। এতক্ষণে শাহবাজ খানের মেজাজ চরমে উঠেছে। তিনি অনেক কষ্টে ধৈর্য ধরে আছেন। কিন্তু তার চেহারায় রাগের ভাব ফুটে উঠেছে। ইমিগ্রেশন কর্মকর্তা আড় চোখে তার দিকে তাকিয়ে দেখলেন। তাকে দেখে আঁচ করতে অসুবিধা হয়নি তার। তিনি শাহবাজ খানের উদ্দেশে বললেন, এক্সকিউজ মি! 
শাহবাজ খান ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার মুখোমুখি দাঁড়ালেন। তিনি নিজে স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করলেন। এতে কিছুটা সময় নিতে হলো তার। তিনি ইমিগ্রেশন কর্মকর্তার দিকে তাকাতেই তার হাতে পাসপোর্ট ধরিয়ে দিয়ে বলল, সরি; আজ আপনার যাওয়া হবে না। 

চলবে...

 

আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...

পর্ব-১পর্ব-২পর্ব-৩পর্ব-৪পর্ব-৫পর্ব-৬পর্ব-৭পর্ব-৮পর্ব-৯, পর্ব-১০পর্ব-১১পর্ব-১২পর্ব-১৩, পর্ব-১৪পর্ব-১৫পর্ব-১৬পর্ব-১৭পর্ব-১৮পর্ব-১৯পর্ব-২০পর্ব-২১পর্ব-২২পর্ব-২৩পর্ব-২৪, পর্ব-২৫,  পর্ব-২৬,

পর্ব-২৭ পর্ব-২৮ পর্ব-২৯পর্ব-৩০,পর্ব -৩১, পর্ব-৩২, পর্ব-৩৩,পর্ব-৩৪, পর্ব-৩৫, পর্ব-৩৬, পর্ব-৩৭, পর্ব-৩৮, পর্ব-৩৯, পর্ব-৪০পর্ব-৪১, পর্ব-৪২

বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২৬ পিএম
বৃষ্টি মনোমুগ্ধকর খুনি
বই

ছয় ঋতুর এই দেশে বর্ষাঋতু ছাড়াও যে ঝুম বৃষ্টির অনুভূতি সৃষ্টি হতে পারে তা এমরান কবিরের পঞ্চম কাব্যগ্রন্থবৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনিনা পড়লে বোঝাই যেত না বর্ষার সময় ঝুম বৃষ্টিতে বারান্দায় বসে বই পড়লে যেমন অজান্তেই বৃষ্টির গতিময় ফোঁটা শরীরে পড়ে, শিহরণ জাগে আর নষ্টালজিয়ায় আক্রান্ত হয় মনএমরান কবিরের এই কাব্যপাঠে সে রকমই অভিজ্ঞতা হলো শব্দের মেঘেও যে বৃষ্টির ছটা থাকে তাও বুঝিয়ে দিল মেঘে গর্জন নেই তবে বর্ষণ আছে ফ্ল্যাপ থেকেই শুরু হয়েছে মেঘের ঘনঘটা, ‘তোমার ভূগোলে আসার পর/ ভেবে দেখ/ কীরূপ ছিল আমার জয়োল্লাস/ আজ ভূগোলের গোলে/ থামিয়ে রেখেছি গান/ ফেরার পথে নিয়ে যাব/ তোমার না-দেখানো-/ বৃষ্টির সোনালি আগুন/ যার জন্য অনেক আগেই আমি/ হয়েছিলাম খুন পুরো কাব্যে যেন এই শৈল্পিক খুনেরই প্রতিধ্বনি

এই বইয়ের উৎসমুখে একটি গদ্য শোভা পেয়েছে সেখানে লিখেছেন তিনি, ‘কোনো ঋতুই আমাদের কাছে পুরাতন হয়ে আসে না যতবারই আসে ততবারই যেন নতুন যেন ছন্দের সাথে ছন্দের সহবাস

কবিতায় বলেছেন তিনি, ‘বাতাস তখন আগুন আগুন,/ পলকে পলকে তার রমণীয় শিখা!’ বৃষ্টির আগে বাতাসের কাছে গ্রীষ্মের যে তীব্রতা তা কবি রমণীয় শিখার সঙ্গে তুলনা করেছেনমেঘ মেঘ গল্পকবিতাটি পড়ার সঙ্গে সঙ্গে  মনে ভেসে ওঠে, ‘বনের ভেতর বন, তাহার ভেতর পালকের গান, উড়ন্ত উচ্ছল তার নয়নের আসমান’–কী শৈল্পিক ছোঁয়ায় তিনি বর্ষাকে জীবন্ত করে তুলেছেন

বাংলার প্রকৃতি, বাংলার মানুষ, বাংলার বর্ষাকে তিনি যেন শব্দের ক্যামেরায় তুলে ধরেছেন এভাবে বাংলার মেঠোপথ ধরে হেঁটে যাওয়া, বর্ষার বৃষ্টি গায়ে মেখে বড় হওয়া এক জলময় চিরায়ত রোমাঞ্চকর বিজ্ঞাপন হয়ে উঠেছে, ‘বৃষ্টি: মনোমুগ্ধকর খুনি কবিতাগুলো

প্রায় প্রতিটি কবিতায় বর্ষার সঙ্গে এক রহস্যের চাঁদমুখ হয়ে ধরা পড়বে একটা চরিত্রঅধ্যাপিকা কে এই অধ্যাপিকা? তিনি বইটি উৎসর্গও করেছেন সেই অধ্যাপিকাকে অথচ তাকে সুনির্দিষ্ট করা দুরূহ বর্ষায় যেমন মেঘ থাকে, ঝড় থাকে, বৃষ্টি থাকে, বন্যা থাকে, বনের ভেতর হারিয়ে যাওয়া পথ থাকে, বৃক্ষের সঙ্গে বৃষ্টির অজ্ঞাত গল্প থাকে, ঠিক তেমনি কাব্যের বর্ণনায়, শব্দে, ভাবে চরিত্র বর্ষার মতোই রহস্য-রোমাঞ্চকর হয়ে ওঠে! কি জলকন্যা? একি বৃষ্টিবিলাসী নারী? কি কাব্যের পূর্ণতা? নাকি প্রকৃতির রূপক? নাকি কবির মনে সদা জেগে থাকা এক সৌন্দর্যের অনুপম মুখ? আবিষ্কারের জন্য পড়তে পড়তে বই শেষ হবে, রহস্যের শেষ হবে না, ‘অধ্যাপিকা,/ আপনি তো খুউব/ সরল অঙ্কের মতো/ তুমুল বৃষ্টিবাহিকা!’ কিংবাসবাই তো ছাত্র, রোদে রোদে থাকি বিস্মিত পাঠে/ তাপে তাপে বাষ্পীয় উত্তাপে, জানতে পারিনি একা/ আপনি এমন মেঘের মতোন উচ্ছল গায়িকা/ এমন ভেজা গান, গেয়ে যান/ ভিজে যায়/ সমস্ত অববাহিকা

মিথ মৈথুনকবিতায় তিনি আরও গাঢ় রহস্যের শ্যামল বনে বৃষ্টির ফোঁটার মতো করে বলে উঠলেন, ‘তার চেয়ে, অধ্যাপিকা/ সবুজ ঘাসের পাশে হাঁটতে থাকুন ধীরে/ আর তাকিয়ে দেখুন বারবার, কী যে অপরূপ রূপ বরষার

বর্ষার সঙ্গে মিলেমিশে একাকার হয়ে গেছে বর্ষার জলে ভেজা ভেজা পথে চলতে থাকা এই নিগুঢ় প্রতীকী চরিত্রটি বর্ষাকে সবাই উপলব্ধি করলেও কবি এমরান কবিরের কাব্য যেন বর্ষার স্বচ্ছ আয়না; অতীত, বর্তমান, দেখা-অদেখা সব একসঙ্গে অধ্যাপিকার  প্রতিটি চরণে, শাড়ির ভাঁজে এসে পাঠক হৃদয়ে ভর করে

মাঠ-ঘাট, জলে ভরা নদী, দিঘি, কূলভাঙা নদী বেয়ে গেয়ে যাওয়া বর্ষার সুখের মাঝি, কাদাময় পথ, বৃষ্টির আলিঙ্গন, বর্ষায় অভাবি গৃহিণীর অনাহারে থাকা, জলে পাতিহাঁসের মতো অবাধ গোসল করা শিশুর দল, ঘরের কোনে নিভৃতে একাকি দুটো মনের এক শরীর হওয়ার রহস্যের খেলাসবই আছে কাব্যে

কাব্যে ছোট ছোট কবিতা থাকলেও শেষে আত্মমগ্ন বীজের প্রত্ন ধারাপাত শিরোনামীয় একটি দীর্ঘ কবিতা সন্নিবেশিত হয়েছে ৩০০ চরণেরও অধিক কবিতা পাঠককে এক অভূতপূর্ব শিল্পআস্বাদনের অভিজ্ঞতা দেবে, ‘একদম নিঃশব্দ একাকিনী/ একান্তে দাঁড়িয়ে, একান্তে শুধু/ তিনি শুদ্ধতম একাকিনী/ আঁচল কোমরে গুঁজে দাঁড়িয়ে থাকেন মাঠে/ সেই সবুজ কৃষাণী

বর্ষার বিপুল, বিস্তৃত বহুমুখী চরিত্র অবদানের সঙ্গে যেমন বহুবিধ আকাঙ্ক্ষা জড়িয়ে আছে তেমনি দীর্ঘ কবিতার সঙ্গে জড়িয়ে আছে কৃষাণীবাংলার চিরায়ত মাতৃরূপিণী অবয়ব তিনি মমতায় সংগ্রামে, শ্রমে শ্রান্তিতে, ত্যাগে তিতিক্ষায়, ভালোবাসায় রুক্ষতায় এক-একক-অদ্বিতীয় তিনি চির বিজয়িনী ভেতরে ভেতরে ক্ষয়ে যাওয়া ইমারতের মতো হলেও বাইরে তার হাসির ছটাযেন পাকা ধান

আমরা জানি বৃষ্টি আমাদের এই অঞ্চলের কৃষি, সভ্যতা সংস্কৃতির কতটাজুড়ে রয়েছে দীর্ঘ কবিতাটিতে তা উঠে এসেছে দারুণভাবে কবিতাটিতে রয়েছে অদ্ভুত আত্মগীতি রয়েছে মায়া মোহনার কথা, নরম মাটি কৃষাণ-কৃষাণীর নরম হৃদয়ের কথা, রয়েছে ধান গানের কথা উৎপাদন আর জেগে উঠবার কথাও সবচেয়ে রয়েছে এক অপরূপ সম্ভাবনার কথা সব মিলয়ে বৃষ্টির সঙ্গে আমাদের রোমান্টিকতা আর চিরায়ত বাংলার সম্বন্ধসূত্র উঠে এসেছে যার সঙ্গে নিবিড়ভাবে জড়িত রয়েছে আমাদের কৃষি, কৃষ্টি, সভ্যতা, সংগ্রাম, প্রেম, কাম আর আর্থ-সামাজিক অবস্থা

কৃষাণী, নাকি অধ্যাপিকাকে বড় হয়ে বর্ষার চির ছায়া হয়ে থাকবে, মেঘের কোলে রহস্য হয়ে থাকবে তা অনুভব করতে এই কাব্য পাঠের বিকল্প নেই! বর্ষা আসবে বারবার কিন্তু কাব্যিক খুনির বিচার হবে না

সৈয়দ আলী আহসান প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:২২ পিএম
প্রথম কবি দেখা ও কয়েক টুকরো স্মৃতি
আঁকা: নিয়াজ চৌধুরী তুলি

আমি তখন নবম বা দশম শ্রেণির ছাত্র আমাদেরলজিং টিচারকলেজে পড়েন একদিন তিনি জানালেন তাদের কলেজে একটি অনুষ্ঠান হবে, এতে যোগ দেবেন দেশের একজন বিখ্যাত কবি আমার মন খুব চাইছে কলেজের অনুষ্ঠানে যেতে

মাথার মধ্যে লেখালেখির পোকা নিঃশব্দে ওড়াউড়ি করে কাকপক্ষীও যেন টের না পায়, গোপনে কাগজকলম নিয়ে বসি লিখি কী লিখি জানি না একজন বিখ্যাত কবিকে দেখার সুযোগ হাতছাড়া করা যায় নালজিং সারকে খুব করে ধরলাম সার রাজিতার সঙ্গে অনুষ্ঠানে যাব কিন্তু বাবার অনুমতি লাগবে আমার বাবা কড়া মানুষ এমনিতে কোথাও যেতে দেন না কিন্তু আমার আবদারে রজি হলেন আমার সে কী আনন্দ!

হলভর্তি লোক ছাত্রছারা তো আছেই অভিভাবক, স্থানীয় গন্যমান্য অনেকেই উপস্থিত ভাগ্য ভালো, মঞ্চের কাছাকাছি বসার জায়গা পেয়ে গেলাম অনুষ্ঠানের মধ্যমণি দেশের বিখ্যাত কবি সৈয়দ আলী আহসান মুখে চাপদাড়ি, পোশাকে পরিপাটি তিনি যখন মাইক্রোফোনের সামনে দাঁড়ালেন, পুরো হল নীরব তিনি দীর্ঘ সময় বক্তৃতা করলেন কঠিন কঠিন বিষয় তার অনেক কথাই মাথায় ঢোকেনি ঢোকার কথাও নয় তার বাচনভঙ্গি খুবই আকর্ষণীয় বুঝি আর না বুঝি শুনতে ভালো লাগছে আমার মুগ্ধতাসামনাসামনি একজন কবিকে দেখছি খেয়াল করলাম, তিনি দুটি চশমা ব্যবহার করছেন একটা খুলে আর একটা পরছেন, সেটাও বদলাচ্ছেন কারণ কী! অনেক পরে জেনেছি, কাছে এবং দূরে দেখার জন্য আলাদা চশমা দরকার হয়

দীর্ঘ বক্তৃতা শেষে কবি নিজের লেখা কবিতা শোনালেন এই প্রথম মনে একটা খটকা লাগল, এটা আবার কেমন কবিতা!? পাঠ্যবইয়ে যে কবিতা পড়ি, এটা তো সেরকম না রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, জসীমউদ্দীন, সুফিয়া কামালএদের কবিতা পড়লে বা শুনলে মনে কেমন দোলা লাগে, এই কবির কবিতায় তেমন দোলা নেই

যাই হোক, কবিতা বুঝতে না পারলেও কবিকে ভালো লেগেছে সব থেকে বড় কথা একজন কবিকে জীবনে প্রথম সামনাসামনি দেখা! কবি সেদিন যে কবিতাটি পড়েছিলেন, নামআমার পূর্ব বাংলা

পরবর্তীত, কলেজের পাঠ্যসূচিতে সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি অন্তর্ভুক্ত ছিল পড়তে হয়েছে, ক্লাসে এটা নিয়ে স্যারের বক্তৃতা শুনতে হয়েছে, পরীক্ষার খাতায় উত্তর লিখতে হয়েছে আগে আমাদের কবিতা পাঠের অভিজ্ঞতায় ছিল ছন্দমিলের কবিতা আগেই উল্লেখ করেছি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, কাজী নজরুল ইসলাম, সুফিয়া কামাল, জসীমউদ্দীনের কবিতায় চরণান্তেমিল’-এর বিষয়টি প্রথম দেখলাম চরণান্তে মিল নেই মাইকেল মধুসূদন দত্তের কবিতায় ক্লাসে স্যার বললেন, এটা অমিত্রাক্ষর ছন্দ শিখলাম চরণান্তের মিল ছাড়াও কবিতা হয় স্যার আরও বললেন, মাইকেলের প্রায় কবিতাই ১৪ মাত্রার চরণে লেখা ১৪ মাত্রা মানে ১৪টি অক্ষর গুনে গুনে দেখলাম, তাই তো! প্রতি চরণে ১৪টি অক্ষরই তো আছে স্যার মাত্রা পর্ব সম্বন্ধেও বললেন ১৪ অক্ষর মানে ১৪ মাত্রা এই ১৪ মাত্রার চরণ আবার দুই ভাগে বিভক্ত প্রথম ভাগে মাত্রা, পরের ভাগে মাত্রা, এই হলো ১৪ শিখলাম মাত্রা আর পর্ব

এই সামান্য জ্ঞান নিয়ে সৈয়দ আলী আহসানের  আমার পূর্ব বাংলাকবিতাটি দেখার চেষ্টা করলাম কবিতাটি এরকম

আমার পূর্ব বাংলা এক গুচ্ছ স্নিগ্ধ,

       অন্ধকারের তমাল

অনেক পাতার ঘনিষ্ঠতায়,

      একটি প্রগাঢ় নিকুঞ্জ

সন্ধ্যার উন্মেষের মতে

সরোবরে অতলের মতো

কালো-কেশ সঞ্চয়ের মতো

বিমুগ্ধ বেদনার শান্তি

আমার পূর্ব বাংলা বর্ষার অন্ধকারে অনুরাগ

ঘুমের অলসতায় চোখ বুঁজে আসার মতো শান্তি

হৃদয় ছুঁয়ে-যাওয়া স্নিগ্ধ নীলাম্বরী

(অংশবিশেষ)

 কবিতার বিষয় দেশানুরাগ গভীর মুগ্ধ অনুভবে দেশকে দেখা গদ্য-ছন্দে লেখা অন্তমিল তো নেই-, নেই মাত্রা পর্ব-সমতা আঁটোসাঁটোভাবে কাব্যালংকার না মেনেও যে উল্লেখযোগ্য কবিতা হতে পারে, সৈয়দ আলী আহসানেরআমার পূর্ব বাংলাএর একটি উদাহরণ

 

দুই.

লেখালেখির এই জীবনে অনেকের সঙ্গে পরিচয় হয়েছে কারও সঙ্গে কালেভদ্রে, কারও সঙ্গে মাঝেমাঝে, কারও সঙ্গে প্রায় নিত্য দেখাসাক্ষাৎ হয় সৈয়দ আলী আহসানের সঙ্গে দেখা হওয়াটা ছিল মাঝেমাঝে, প্রয়োজনে কেউ কেউ যেমন করেন, বয়সের দেওয়াল তুলে অনুজদের একটু দূরেই রাখেন সৈয়দ আলী আহসান ছিলেন এর বিপরীত বৈশিষ্ট্যের মানুষ অনুজদের তিনি সহজ আনন্দে গ্রহণ করতেন

একবার হলো কী, আমি রেডিওতে কবিতা পাঠের অনুষ্ঠানে অংশ নিয়েছিলাম শাহবাগ তখন রেডিওর প্রধান কেন্দ্র উপস্থিত হয়ে দেখি আমি যাদের সঙ্গে কবিতা পড়ব, তারা সবাই দেশের খ্যাতিমান কবি, আমি একমাত্র কবিযশঃপ্রার্থী তরুণ এক-দুজন তো তাচ্ছিল্য করল আমি মেনে নিয়েছি কারও কারও খ্যাতির অহংকার তো থাকতেই পারে রেওয়াজ অনুযায়ী অনুষ্ঠানের শেষ পর্ব পঠিত কবিতার ওপর আলোচনা অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সৈয়দ আলী আহসান সেদিন আমার লেখার মৃদু প্রশংসাই করেছিলেন

বহুমাত্রিক লেখক সৈয়দ আলী আহসানের গ্রন্থসংখ্যা অনেক শুধু সংখ্যা বিচারে নয়, বিষয়-বৈচিত্র্যেও সমৃদ্ধ এর মধ্যে একটি বইয়ের কথা এখানে উল্লেখ করছি বইটির নামপ্রেম যেখানে সর্বস্ব উল্লেখ করার কারণ, এই বইটির আমিআঁতুড়-সাক্ষী

আমি তখন একটি সাপ্তাহিক পত্রিকায় যুক্ত ওই কাগজে সৈয়দ আলী আহসানের আনেক লেখা ছাপা হয়েছে যখনই চেয়েছি, সৈয়দ আলী আহসান লেখা দিয়েছেন তবে লেখাটি তৈরি হতোশ্রুতিলিখনপদ্ধতিতে

প্রেম যখানে সর্বস্বএকটি সংকলন গ্রন্থ এই সংকলন গ্রন্থের প্রায় সবকটি লেখারই আমি ছিলামশ্রুতি লেখক নির্দিষ্ট সময়ে যেতাম সৈয়দ আলী আহসানের কলাবাগান এলাকার বাসায় তিনি আগে থেকেই যেন প্রস্তুত থাকতেন আমি খাতাকলম নিয়ে বসতাম তিনি চোখ বুঁজে বলতেনধীর গতি, স্পষ্ট উচ্চারণ হাতের কাছে কোনোরেফারেন্সনেই তিনি বলে যাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট সব তথ্যই তার মুখস্থ লেখার শেষ বাক্যটি বলে চোখ খুলতেন, বলতেন, চলবে তো? মননশীল আধুনিক কাব্যবোধ, চিত্রকলা, প্রেমানুভূতির বহুমাত্রিকতা ছিল লেখাগুলোর বিষয় ফরাসি সাহিত্যের আনুপূর্বিক খুঁটিনাটি, শিল্পকলার বাহ্যিক সৌন্দর্য অন্তর-ঐশ্বর্য তার ওইসব লেখায় বিস্তৃত চিত্রশিল্প বা ভাস্কর্য বিশ্লেষণেনারীবিষয়টি সৈয়দ আলী আহসানের লেখায় বিস্তৃত নতুন মাত্রা পেত বিশেষ করে নারীশরীরের সৌন্দর্য মাহাত্ম্য বর্ণনায় তার ভাষা-প্রাঞ্জলতায় শিল্পচেতনারূপ দ্যুতি ছড়াত

অসংকোচেই বলি, শ্রুতিলেখক হিসেবে আমি বেশ আনন্দই পেতাম

গ্রন্থকথা মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
মিথ্যার চোরাস্রোত বয়ে যায়
বই

একটি সুন্দর জাতি গঠন করতে হলে অবশ্যই বই পড়তে হবে বই মানুষের সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায় আমেরিকান কবি জেমস রাসেল বলেছেন, ‘বই হলো এমন এক মৌমাছি যা অন্যদের সুন্দর মন থেকে মধু সংগ্রহ করে পাঠকের জন্য নিয়ে আসে প্রসঙ্গে দুঃখ করে বাংলা ভাষার সবচেয়ে জনপ্রিয় কথাসাহিত্যিক শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় বলেছেন, ‘আমাদের দেশের লোক বই পড়েন বটে, কিন্তু পয়সা খরচ করে কিনে পড়েন না’…

আশির দশকের শেষপ্রান্তের কবি শামীম আহমদের এগারোতম কবিতার বইটি এবারের বইমেলায় এসেছে গ্রন্থে ছাপ্পান্নটি কবিতার পাঠোদ্ধার করা গেল তবে, শামীম আহমদের কবিতা স্বপ্রণোদিতভাবে একটি ভিন্ন পরিচয় নিয়ে আসে, তার কবিতা যারা নিয়মিত পড়েন তাদের কাছে সেটা উন্মোচিত হয় তার কবিতায় অসংখ্য পাশ্চাত্য প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প ব্যবহার হয় এবং বেশ দক্ষভাবে তবে বর্তমান আলোচ্য কাব্যগ্রন্থে এই স্বাভাবিক প্রবণতার স্বল্পতা লক্ষণীয় এবং কেন যেন কবি ভীষণ ক্রুদ্ধ হয়ে কবিতাগুলো লিখেছেন এবং বেশ সহজভাবে প্রকাশ করেছেনযেখানে শুধু বানিয়ার বাণিজ্য বিতানে/ বোধের বাণিজ্য হয় দেশাত্ববোধের মোড়কে,/ এই চটকদার বিজ্ঞাপনে/ আমি ভুলে যাই জন্মমূল মায়ের জঠরের সুতীব্র আর্তনাদ’ (আমি মাতৃভূমি: পৃ-৪৮)জংধরা জ্যোৎস্না দেখে প্রফুল্ল হওয়া নিরেট মূর্খতা/ এর চেয়ে মোমবৃক্ষের আলো নিষ্পাপ পবিত্র/ নিজকে পুড়িয়ে লীন হয়ে যায়/ আঁধারের যবনিকাপাতে’ (বর্তমান তারুণ্যের প্রতি: পৃ-৩৮) কবি universal true চাঁদের আলোকেও আজকের দেশ সমাজের অধোগতি দেখে পুরো ক্রোধে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেনরূপকের এই দেশে আমি বড্ড সন্দিহানপ্রতিকী আলখেল্লায়, দূর্যোধনের তীরের মতো/ চিকচিক করে দৃষ্টির ফলা/ কখন যে আঁচড়ে পড়ে মৃত্যুর সওদা নিয়ে কে জানে’ (সফেদ হাঙ্গর: পৃ-৪৬) চারপাশের অবক্ষয় দেখে কবি সন্দিহান কখন যে সমাজ, জনপদ কুজনের দ্বারা ধ্বংসপ্রাপ্ত হয়, তা কবি দিব্যদৃষ্টিতে foresee করতে পারছেন নিবেদিতপ্রাণ কবিই সমাজের এই অধঃপাত দেখতে পারেন কারণ কবি শিষ্টজন তিনি বলে ওঠেন, ‘হে বন্ধু আমার, তুমি কি দেখো নৈসর্গিক বিলাস?/ আমি সব দেখে চোখ বুজি/ নৈষ্ঠিক ঋষির মতো/ বুকের গভীরে পুঁতে রাখি আরাধনার বীজ’ (নৈষ্ঠিক ঋষি: পৃ-৪৭)ডানাভাঙা পায়রা/ হাওয়ায় খুঁজে ফেরে আঁততায়ীর মুখ.../ রোদের গায়ে কান্না, লেগেছিল রক্তের দাগ আজ মনে হয় সময়ের স্রোতে/ মিশে যাচ্ছে সব স্মৃতি’ (আঁততায়ীর মুখ: পৃ-৬২)

শামীম আহমদের কবিতার একজন নিয়মিত পাঠক হিসেবেই বলা যায়, তার কবিতায় থাকে প্রতীক, মিথ, চিত্রকল্প, উৎপ্রেক্ষা ইত্যাদি যা অত্যন্ত সুনিপুণভাবে তিনি প্রয়োগ করেন, যা অনেক বোদ্ধা কবির কাছেও ঈর্ষণীয় হয়ে দাঁড়ায় কিন্তু কাব্যের সামগ্রিক ছাপ্পান্নটি কবিতা পড়লে মনে হয় কবি চটজলদি কবিতাগুলো লিখে ফেলেছেন যার কাছে কবিতা লেখার সময় শক্তি চট্টোপাধ্যায়, নীরেন্দ্রনাথ চক্রবর্তী, বুদ্ধদেব বসু, জীবনানন্দ, শহীদ কাদরী এসে টেবিলের চারধারে ঘিরে ধরেন, তার কাছ থেকে এত চটজলদি কবিতাগ্রন্থ পাঠক কামনা করে না এমনও হতে পারে দেশ সামাজিক পরিবেশের সাম্প্রতিক দৈনতা তাকে ক্রুদ্ধ করে তুলেছে তবুও তার কবিতা এক অনন্যতার জন্য আমাদের চিন্তাজগৎকে আচ্ছন্ন করে

সিলেটের ভাস্কর প্রকাশন মুদ্রণে রাজধানীর সেরা প্রকাশনকেও হার মানিয়েছে প্রচ্ছদ অত্যন্ত সুন্দর অঙ্কন করেছেন আল নোমান

কবিতা অনুবাদ হয় না মানুষের

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০৭ পিএম
আপডেট: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:১১ পিএম
অনুবাদ হয় না মানুষের

সব মানুষই পরিব্রাজক

পানিপথের যুদ্ধ থেকে

            বিসমিল্লাহ খাঁর সানাই পর্যন্ত

 

যুদ্ধ যুদ্ধ খেলা ছেড়ে

কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে

কার্তুজও জানে

            কখনো না কখনো জাগতে হবে

 

জন্মসূত্রেই মানুষ শিখেছে হানাহানি

প্রয়োগও করছে

            প্রেমে কিংবা রাষ্ট্রতন্ত্রে

 

            মানুষ কখনোই অনূদিত নয়...

কবিতা স্মৃতির ভেতর

প্রকাশ: ১৯ জুন ২০২৬, ১২:০১ পিএম
স্মৃতির ভেতর

যে ঢেউ ঘুমায় না সমুদ্রের মন্থর বুকে, পাশ ফিরে খোঁজে সমসূত্র-ছেঁড়া ফেরারি ঢেউ; তার মতো একাকী রাত জেগে আছি বুকের উঠোনে সুতীব্র বেদনার মাশরুম ছিঁড়ে ছিঁড়ে পড়ে, চিতার কালো জোছনা ঝরে পড়ে নখরে নখরে

 

হরিণখোলা মুণ্ডেশ্বরীর জলে যে দেহাতি সন্ধ্যা বিসর্জন-বিসর্জন খেলে, তুমি তার মতো আমাকে বিসর্জন দিয়ে গেছ এই স্যাঁতসেঁতে শহরে কতকাল শাদা পালকের তারাদের কোন্ডর পাখিদের মতো ডানা মেলে নামতে দেখিনি শালিকদের চরাচরে

 

আহা, কী নিখুঁত পরিকল্পনা তোমার! তবুও আতপচালের গন্ধমাখা স্মৃতির ভেতর

সোনামুখী সুই দিয়ে সেলাই করে যাব ছেঁড়া ছেঁড়া মায়ার কাহন