পঞ্চচত্বারিংশ পর্ব
শোনো, তোমার আর কোথাও যাওয়ার দরকার নেই। তোমাকে পুলিশ ধরবে না। তুমি বাসাতেই থাকো। বউমা, বাচ্চাদের সময় দাও। কারও সঙ্গে যোগাযোগ করার দরকার নেই। একদম চুপচাপ বাসায় বসে থাকো। বাসার সিকিউরিটির লোকদের বলে দাও, তুমি বাসায় আছ এটা যাতে কেউ জানতে না পারে।
শাহবাজ খানের খাওয়া বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি বিস্ময় আর আবেগমাখা দৃষ্টিতে বৈরম খানের দিকে তাকিয়ে আছেন। শাহজাদার চোখেমুখেও বিস্ময়ের চাপ। বৈরম খান দু-একবার শাহবাজ খান ও শাহজাদার দিকে তাকিয়ে আবার মুখে খাবার তুলে নিলেন। কিন্তু স্টমাক আর সায় দিচ্ছে না। এক ঢোক পানি মুখে নিয়ে কোনোরকমে খাবারটা গিললেন। তার পর শাহজাদাকে উদ্দেশ করে বললেন, দাদুভাই, কফি দিতে বলো।
জি দাদুভাই। আমি নিয়ে আসছি।
শাহজাদা উঠতে যাচ্ছিল। ঠিক তখনই কুদ্দুস আলী কফি নিয়ে হাজির। শাহজাদা শুধু ট্রে থেকে নামিয়ে বৈরম খানের সামনে দিল। তাতেই বৈরম খান খুশি। কফিতে চুমুক দিয়ে তিনি বললেন, ধন্যবাদ। কফিটা ভালো হয়েছে।
শাহজাদা হাসি হাসি মুখ করে বৈরম খানের দিকে তাকাল। বৈরম খান আরেকবার কফিতে চুমুক দিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তার পর হনহন করে সদর দরজার দিকে এগিয়ে গেলেন। শাহবাজ খান আর শাহজাদা তাকে অনুসরণ করে। গাড়িতে ওঠার আগে শাহবাজ খানের কাঁধে হাত রেখে বললেন, বাঁদরামি অনেক হয়েছে। তোমার কারণে নীলিমা চলে গেছে। এটা কি তুমি বুঝতে পারছ? এবার ছেলেমেয়েকে সময় দাও। আর বাইরে সুখ খোঁজার চেষ্টা করো না। আমার কথা বোঝার চেষ্টা করো। তোমার বাচ্চা দুটি এখনো অনেক ছোট। তুমি ছাড়া ওদের আর কেউ নেই!
দাদুভাইয়ে কথায় আবেগপ্রবণ হয়ে যায় শাহজাদা। তার দুই চোখ দিয়ে পানি পড়তে থাকে। সে লুকিয়ে সেই চোখের পানি আড়াল করার চেষ্টা করে। ছেলের নীরব কান্না দেখে ফেলেন শাহবাজ খান। বৈরম খানকে বিদায় দিয়ে তিনি ছেলের কাছে এগিয়ে যান। সান্ত্বনার হাত রাখেন তার কাঁধে।
টানা প্রায় তিন বছর ধরে করোনা নামক মহাবিপদ মানুষকে বিপর্যস্ত করে তুলেছে। মানুষের নিদারুণ কষ্টের কারণই শুধু নয়; করোনা অসংখ্য মানুষের জীবনও নিয়েছে। অনেকেই করোনার আঘাতে জর্জরিত হচ্ছে। এখনো প্রতিদিন গড়ে আড়াই লাখের মতো মানুষ করোনায় আক্রান্ত হচ্ছে। আর মারা যাচ্ছে পাঁচ শ-এর মতো। আক্রান্তদের শরীর নামক যন্ত্রটাকে একেবারে দুমড়ে-চুমড়ে নিঃশেষ করে দিচ্ছে। অনেকের স্মৃতিশক্তি হ্রাস পাচ্ছে। আবার অনেকে অন্য কোনো রোগেও আক্রান্ত হচ্ছে। একবার আক্রান্ত হলে আগের অবস্থায় আর শরীরকে ফেরানো যায় না। শরীরে সবলতা থাকে না। রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা হারায়। অনেক ক্ষেত্রে অ্যান্টিবায়োটিক কোনো কাজ করে না।
শুধু তাই নয়, প্রতিনিয়ত মানুষের স্বপ্ন ভাঙছে, সংসার ভাঙছে। আশা-আকাঙ্ক্ষা চুরমার হয়ে যাচ্ছে। লয়-প্রলয় ঘটছে চাকরি ও ব্যবসা ক্ষেত্রে। কেউ হারাচ্ছে চাকরি, আবার কারও প্রতিষ্ঠিত ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ করে দিতে হচ্ছে। এমনি যখন পরিস্থিতি তখন একটি যুদ্ধের উত্তাপ সহ্য করা মানুষের পক্ষে অসম্ভব। অথচ রাশিয়া এই কঠিন পরিস্থিতির মধ্যেই প্রতিবেশী ছোট দেশ ইউক্রেনের সঙ্গে যুদ্ধ চালিয়েই যাচ্ছে। প্রতিদিন মানুষ মরছে। বিভিন্ন শহরের বাড়িঘর ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়েছে। হাজার হাজার মানুষ নিজের বাড়ি ছেড়ে অন্য দেশে পাড়ি জমিয়েছে। যুদ্ধের উত্তাপ যে শুধু বাংলাদেশের গায়ে লেগেছে তা নয়, সারা বিশ্বেই এর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। জ্বালানি ও ভোজ্য তেলের দাম বেড়েই চলছে। খাদ্যদ্রব্যের দামও দিন দিন মানুষের ক্রয়ক্ষমতার বাইরে চলে যাচ্ছে। আগামী বছর খাদ্যসংকট ভয়াবহ হবে বলে বিশ্ব খাদ্যসংস্থা সতর্ক বার্তা দিয়েছে।
আসিফ আহমেদের লেখাটা এভাবেই এগোচ্ছিল। লিখতে লিখতে একটা সময় কলম থেমে গেল। কলম আর এগোল না। ধীরে ধীরে তার ব্রেইন যেন ফ্রিজ হয়ে গেল। হাজারো দুশ্চিন্তা তাকে গ্রাস করল। একদিকে নানামুখীসংকট আর অন্যদিকে পত্রিকার চিন্তা। কীভাবে এটিকে সচল রাখা যায় সেই চিন্তায় বিভোর তিনি। সবাইকে সময়মতো বেতন দেওয়া নিয়ে তাকে অস্থির থাকতে হয়। প্রথম প্রথম বিনিয়োগকারীদের ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা থাকলেও অচিরেই তাতে ভাটা পড়ে। কী কারণে ভাটা পড়ে তা বুঝে উঠতে পারছেন না তিনি। মাঝেমধ্যে বিষয়টা নিয়ে তিনি ভাবেন। সেই ভাবনারও কোনো কূলকিনারা পান না। তবে বিনিয়োগকারীদের মধ্যে ঝামেলা যে একটা হয়েছে সেটা স্পষ্ট। ভুল বোঝাবুঝিও হতে পারে। তারা এখন আর প্রতিশ্রুতি রক্ষা করছে না। সময়মতো টাকা-পয়সা দিচ্ছে না। এসব বিষয় আসিফ আহমেদের মাথায় ঘুরপাক খায়। লেখার একপর্যায়ে তিনি থেমে যান। কখন যে লেখা বন্ধ হয়েছে তা তিনি নিজেও বুঝতে পারেননি। তিনি আনমনা হয়ে যান। তার দৃষ্টিতে নানা রহস্য লুকিয়ে আছে। সেই রহস্য ভেদ করার সাধ্য কারও নেই।
অফিসের কেউ কেউ আসিফ আহমেদের সঙ্গে কথা বলবে বলে তার রুমের সামনে এসে উঁকিঝুঁকি দিচ্ছিল। কিন্তু তার অন্যরকম মনোভাব দেখে কেউ আর ঢোকার সাহস করল না। আসিফ আহমেদ নিজেও বিষয়টা উপলব্ধি করতে পারছিলেন না। আর তাই তিনি স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করছিলেন। তার সেই চেষ্টা ব্যর্থ হয়েছে। তিনি নিজেই নিজের কাছে যেন পরাজিত এক সৈনিক। তাহলে কি তিনি সত্যি সত্যিই পরাজিত হতে চলেছেন! তিনি কি অন্যায়ের কাছে হার মানবেন? অন্যায়কে প্রশ্রয় দেবেন? এমন জমানা পড়েছে, যেন সবকিছুর নিয়ন্ত্রক হয়ে গেছে অর্থ। আগে বলা হতো, অর্থই অনর্থের মূল। এখন এর উল্টোটা বলা হয়। অর্থই সব সুখের মূল। আসলেই কি তাই?
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,
পর্ব-২৭ পর্ব-২৮ পর্ব-২৯, পর্ব-৩০,পর্ব -৩১, পর্ব-৩২, পর্ব-৩৩,পর্ব-৩৪, পর্ব-৩৫, পর্ব-৩৬, পর্ব-৩৭, পর্ব-৩৮, পর্ব-৩৯, পর্ব-৪০, পর্ব-৪১, পর্ব-৪২, পর্ব-৪৩