ষট্চত্বারিংশ পর্ব
পত্রিকাটিকে ধরে রাখাই আসিফ আহমেদের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো কারণে অর্থের জোগান বন্ধ হয়ে গেলে বিরাট ভাবমূর্তিসংকটে পড়বেন তিনি। কারণ, তার নামের ওপরই পত্রিকাটি দাঁড়িয়ে আছে। তার পরম যত্নে লালিত-পালিত হচ্ছে। একটি শিশু জন্ম নেওয়ার পর যেভাবে মা তার সন্তানকে আদর-ভালোবাসা আর মমতা দিয়ে তিল তিল করে বড় করে তোলেন; সেভাবেই আসিফ আহমেদ পত্রিকাটিকে নিয়ে অগ্রসর হচ্ছেন। তার ভাবমূর্তির কারণেই পত্রিকাটি দ্রুত গতিতে সামনের দিকে অগ্রসর হচ্ছে। এর ব্র্যান্ড ইমেজ অত্যন্ত ভালো। কোনো দলীয় প্রলেপ নেই। কোনো নিউজ হাইড করার উদাহরণ নেই। মিথ্যা কিংবা ভালোগার কোনো নিউজ নেই। কোনো কারণে কোনো নিউজ ড্রপ করতে হয়নি। দেশের বিশিষ্টজনরা এই পত্রিকায় নিয়মিত লেখেন। সব মিলিয়ে অত্যন্ত ইতিবাচক ভাবমূর্তি নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে পত্রিকাটি। অতি অল্প সময়ে জায়গা করে নিয়েছে। এখন শুধু ধরে রাখতে পারলেই এটি লাভজনক একটি প্রতিষ্ঠানে রূপ দেওয়া যাবে। কিন্তু ব্যাপারটা বিনিয়োগকারীরা বুঝতে পারছেন না। আসলে তারা এর গুরুত্বই উপলব্ধি করতে পারছেন না। তাই বিনিয়োগ নিয়ে নানারকম বাহানা করছেন।
আসিফ আহমেদ হঠাৎ রুম থেকে বিদ্যুৎ গতিতে বের হলেন। তিনি অফিসের দরজা খুলে বাইরে চলে গেলেন। এমন ভাব দেখালেন যে, তার কাছে বিশেষ কোনো অতিথি এসেছে। তাকে রিসিফ করতে এগিয়ে গেছেন। আবার এমনও কেউ কেউ ভাবতে পারেন, বিশেষ কারও সঙ্গে ফোনে কথা বলছেন। তিনি তার কথাগুলো অফিসের কাউকে জানাতে চান না।
অফিসে কানাঘুষা শুরু হয়েছে। একজন আরেকজনের চোখের দিকে তাকিয়ে চোখের ইশারায় কথা বলছে। কেউ কেউ মুচকি হাসছে। কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে নিচু গলায় খুশি বলল, সম্পাদক ভাইয়ের কী হলো? মনে হচ্ছে কোনো ঝামেলা লাগছে। বড় কোনো ঝামেলা। কথাবার্তায় সেই রকমই মনে হচ্ছে। আমরা যে কোথায় এসে পড়লাম! কপালে যে কী আছে বিধাতাই জানেন!
দিনা ফিসফিস করে বলল, বাদ দাও না! আদার ব্যাপারীর হাজারের খবর রাইখ্যা কী লাভ? শুধু শুধু দুশ্চিন্তা! আমরা কামলা মানুষ। আমাদের অত চিন্তা কইরা জীবন নষ্ট করার কী দরকার?
খুশি বিস্ময়ের সঙ্গে বলল, আরে! এইটা কোনো কথা হইল? আমাদের জানতে হবে না? কারা বিনিয়োগকারী? যদি দুই দিন পর বেতন বন্ধ হইয়া যায়! আমরা সম্পাদকের সৎ ভাবমূর্তি দিয়া পানি খামু!
দিনা জিহ্বার ওপর দাঁত চেপে বলল, আস্তে আস্তে! কেউ শুনে ফেললে সর্বনাশ হয়ে যাবে!
সর্বনাশ আর কী হইব? আমার মনে হয়, আমরা এইখানে আইসা যেন ফাইসা গেছি! মানুষ বলে না, মাইনকার চিপা! আমরা সেই মাইনকার চিপায় পড়ছি!
কথার মাঝখানে বীনু এসে দুজনের কাঁধের ওপর দুই হাত রেখে মাথা নিচু করল। তার পর নিচু গলায় বলল, কী হয়েছে? ফিসফিস করে দুজনে কী কইতেছ?
দুজনই বীনুর দিকে একবার তাকিয়ে কম্পিউটার স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে আছে। কোনো জবাব দিচ্ছে না। এরা দুজন বীনুকে খুব একটা পছন্দ করে না। বীনুর গলা না যেন ফাঁটা বাঁশ। হাসলে যেন বিল্ডিং কাঁপে। চিৎকার দিয়ে কথা বলে। ওকে কোনো কথা বললে মুহূর্তের মধ্যে তা রাষ্ট্র হয়ে যায়। তাই খুশি ও দিনা মুখে কুলুম এঁটেছে। কিন্তু বীনু ওদের মুখ থেকে কথা বের করবেই- এমন একটা ভাব। সে দুজনকেই ঘাড়ের ওপর ঘাই মেরে বলল, বল না কী হয়েছে?
খুশি বিরক্তির সঙ্গে বলল, কিছু হয়নি।
কিছু হয়নি মানে! এতক্ষণ যে তোরা কথা বললি!
দিনা বলল, ব্যক্তিগত বিষয়। ওসব শুনে তোমার কাজ নেই।
বীনু মুখ গোমরা করে বলল, তাহলে বলবি না?
খুশি ও দিনা কোনো কথা বলল না। বীনু চিৎকার চেঁচামেচি করতে করতে বলল, আমার সঙ্গে কেন জানি মানুষ সতীনের মতো আচরণ করে! কেন করে আমি বুঝি না। আমি কী খুব খারাপ মানুষ?
খুশি ও দিনা চোখ বড় বড় করে বীনুর দিকে তাকায়। বিব্রত আর বিস্ময়ের একটা ছাপ তাদের মুখাবয়বে।
বাইরে প্রচণ্ড রোদ। রোদের উত্তাপে যেন আগুনের ফুলকি ঝরছে। ভ্যাপসা গরম। দিনে দিনে ঢাকা শহর যেন মরু শহরে পরিণত হতে যাচ্ছে। দিল্লি-কলকাতার পর ঢাকা শহরও উত্তপ্ত জনপদে পরিণত হচ্ছে। অনেকেই বলছেন, এটা জলবায়ু পরিবর্তনজনিত সমস্যা। সমুদ্রে পানির উচ্চতা দ্রুত বাড়ছে। হিমালয়ে বরফ গলছে। কর্কটক্রান্তি রেখার প্রভাবে এসব পরিবর্তন পরিলক্ষিত হচ্ছে বলে বিশেষজ্ঞরা ধারণা করছেন। ভবিষ্যতে এই অঞ্চল যদি মরুভূমিতেও পরিণত হয় তাহলে অবাক হওয়ার কিছু থাকবে না।
সোনারগাঁওয়ের লবিতে বসে এমনটাই ভাবছিলেন আসিফ আহমেদ। তিনি এক ব্যবসায়ীর সঙ্গে বৈঠকে বসেছিলেন। তিনি পত্রিকায় বিনিয়োগ করবেন বলে আশ্বস্ত করেছিলেন। তিন দিনের মাথায় কি এমন ঘটল যে, তিনি নেগেটিভ হয়ে গেলেন! এখন বলছেন দেখি কি করা যায়! অথচ আগামী মাসের বেতন কীভাবে হবে তা জানেন না আসিফ আহমেদ। ব্যবসায়ী লোকটির কথায় যারপর নাই হতাশ হয়েছেন
আসিফ আহমেদ।
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,
পর্ব-২৭ পর্ব-২৮ পর্ব-২৯, পর্ব-৩০,পর্ব -৩১, পর্ব-৩২, পর্ব-৩৩,পর্ব-৩৪, পর্ব-৩৫, পর্ব-৩৬, পর্ব-৩৭, পর্ব-৩৮, পর্ব-৩৯, পর্ব-৪০, পর্ব-৪১, পর্ব-৪২, পর্ব-৪৩