পঞ্চত্রিংশ পর্ব
বুকে হাত দিয়ে বলো। আমার চোখের দিকে তাকিয়ে বলো। আমার মাথায় হাত রেখে বলো।
মেহেরুন্নেসা; বললাম তো আমি তোমার কাছে কোনো কিছু লুকাই না।
তাহলে এত লেখালেখি তোমাকে নিয়ে হয় কেন? অন্য কাউকে নিয়ে হতে পারে না!
ব্যাপারটা তোমাকে বুঝতে হবে। এমনিতেই স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় গুরুত্বপূর্ণ। করোনা মহামারির কারণে সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয়ে হয়ে উঠেছে। ফলে সবার চোখ আমাদের দিকে। আমাদের একটুখানি খুঁত পেলেই ঝাঁপিয়ে পড়ে।
সেই একটুখানি খুঁত থাকবে কেন?
আহা! আমাকে শেষ করতে দাও। একটি মহল তো ওত পেতে বসে আছে; সরকারকে কীভাবে ফেলে দেওয়া যায়। তাদেরই একটি মহল আমাদের গায়ে কালিমা লেপে দেওয়ার কাজে সক্রিয় রয়েছে। তুমি বিশ্বাস করো, আমি কোনো দুর্নীতির সঙ্গে জড়িত না। তাহলে অল্প হলেও তো তুমি টের পেতে। তবে হ্যাঁ, মন্ত্রণালয় কিংবা স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের কেউ কেউ জড়িত থাকতে পারে। তাদের ধরা খুব কঠিন। বেশি ধরতে গেলে নিজের গদিই থাকবে না।
মন্ত্রীর কথাগুলো মনোযোগ দিয়ে শুনলেন মেহেরুন্নেসা। কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তিনি বোঝার চেষ্টা করছেন। কিছুক্ষণ পর বললেন, শোন, দুর্নীতির প্রশ্রয়দাতাও কিন্তু দুর্নীতির অভিযোগে অভিযুক্ত।
হ্যাঁ, তোমার কথা আমি মানি। কিন্তু আগে তো দুর্নীতিবাজকে ধরতে হবে! ধরতে না পারলে তো আমি কাউকে বলতে পারব না কে দুর্নীতিবাজ! যদি ধরতে পারি তাহলে শাস্তি দেব। এটা তোমাকে আমি নিশ্চিত করে বলতে পারি।
মেহেরুন্নেসা তার প্রিয় স্বামীর কাছে এগিয়ে গেলেন। তাকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বললেন, দেখ কেউ তোমার সমালোচনা করলে আমার খুব কষ্ট হয়। আমি তোমার সুনাম চাই। দুর্নাম না। ভালো কাজ করলে অবশ্যই তোমাকে সবাই ভালো বলতে বাধ্য। তোমার বেফাঁস কথা নিয়েও মানুষ হাসাহাসি করে। তখন মনে হয় মরে যাই!
স্বাস্থ্যমন্ত্রী মেহেরুন্নেসার চোখের পানি মুছে দিলেন। মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, মেহেরুন্নেসা তুমি দেখ; একদিন মানুষ ঠিকই আমার কথা মনে করবে। একটু ধৈর্য ধরো। রাজনীতি করলে ধৈর্যশীল হতে হয়। অনেক কামড় সহ্য করতে হয়।
মেহেরুন্নেসার আবেগ যেন আরও বহু গুণ বেড়ে যায়। তার চোখ দিয়ে দরদর করে পানি পড়তে থাকে। তিনি স্বামীর বুকে মাথা রেখে সান্ত্বনা খোঁজার চেষ্টা করেন। মন্ত্রী ডান হাত দিয়ে মেহেরুন্নেসাকে বুকের মধ্যে চেপে ধরেন। আবেগ-ভালোবাসার এক অভূতপূর্ব মুহূর্ত তাদের সামনে এসে দাঁড়ায়।
ফজরের আজানের ঠিক আগ মুহূর্তে ঘুম ভেঙে যায় মেহেরুন্নেসার। তিনি বিছানায় এ পাশ-ও পাশ করছিলেন। নানা দুর্ভাবনা তাতে চারদিক থেকে ঘিরে ধরে। তিনি এসব ভাবনাকে আমলে নিতে চান না। তার পরও এড়াতে পারেন না কিছুতেই। তিনি তার অশান্ত মনটাকে শান্ত করার জন্য দুই রাকাত তাহাজ্জুদ নামাজ আদায় করলেন। আল্লাহর কাছে পানাহ চাইলেন। তিনি বললেন, হে আমার ভাগ্যবিধাতা, আমরা যদি অজ্ঞাতসারেও কোনো অন্যায় করে থাকি তাহলে আমাদের মাফ করে দাও। আমাদের যে সম্মান দিয়েছ তা ধরে রাখার শক্তি দাও। আমরা যেন অন্যায়ভাবে কোনো প্রতিহিংসার শিকার না হই। কোনোরকম ষড়যন্ত্রের শিকার না হই। হে আমার বিধাতা, অতীতেও যদি কোনো গুনাহ করে থাকি তাহলে মাফ করে দাও। আমাদের সব রকম পাপ কাজ থেকে বিরত রাখো।
মেহেরুন্নেসা মোনাজাত শেষ করতে না করতেই চারদিক থেকে আজানের ধ্বনি ভেসে এল। তিনি চোখ বন্ধ করে আজান শুনলেন। আজান শেষ হওয়ার পর তিনি ফজরের নামাজ আদায় করলেন। নামাজ শেষ করে আবারও মোনাজাত ধরলেন। মোনাজাত ধরে অনেকক্ষণ তিনি কান্নাকাটি করলেন। তার পর তিনি বারান্দায় গিয়ে কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি করেন। দোতলা থেকে তিনি দেখলেন, হকার পত্রিকা নিয়ে বাড়িতে ঢুকেছে। পত্রিকা নেওয়ার জন্য তিনি নিচতলায় নেমে এলেন। সদর দরজার সামনে রেখে যাওয়া পত্রিকাগুলো হাতে নিলেন। সবগুলো পত্রিকায় চোখ বুলিয়ে সেগুলো টি-টেবিলের ওপর রেখে দিলেন। শুধু প্রথম আলো হাতে নিয়ে ওপরে উঠে গেলেন।
মেহেরুন্নেসার শোবার ঘরের এক কোণায় লেখাপড়ার জন্য একটি টেবিল ও একটি চেয়ার রয়েছে। তিনি প্রতিদিন এখানে বসেই পত্রিকা পড়েন। আজ তিনি তার নির্ধারিত আসনে না বসে বিছানার ওপর বসে পত্রিকার পাতা ওল্টাতে শুরু করলেন। পত্রিকার প্রথম পাতায় বড় করে রোজিনা ইসলামের একটি খবর দেখে তার চোখ আটকে গেল। তিনি শুধু হেডলাইনটা পড়লেন। সাহসী সাংবাদিকতার জন্য রোজিনা ইসলাম আন্তর্জাতিক পুরস্কারে ভূষিত হয়েছেন। এর নাম ফ্রি প্রেস অ্যাওয়ার্ড।
এর পর আর পড়তে পারলেন না মেহেরুন্নেসা। তার মন খুব খারাপ হয়ে গেল। তিনি পত্রিকাটা সরিয়ে রাখলেন। তার মনের মধ্যে হাজারো ভাবনা; হাজারো প্রশ্ন। তার মানে রোজিনা যা লিখেছে তা সবই সত্যি! মন্ত্রী যা বলেছেন এবং রোজিনা নিয়ে যে মামলা টামলা হয়েছে তা সবই মিথ্যা! তাই তো মনে হচ্ছে! তা না-হলে একটি আন্তর্জাতিক সংস্থা তাকে কেন পুরস্কার দেবে? তারা নিশ্চয়ই মিথ্যা কোনো রিপোর্টের জন্য পুরস্কার দেবে না! তার মানে, ডাল মে কুচ কালা হ্যায়।
মেহেরুন্নেসা আবার পত্রিকা হাতে নিলেন। রোজিনার পুরস্কার লাভের খবরটি তিনি পড়তে শুরু করলেন। খবরে বলা হয়, নেদারল্যান্ডসের আমস্টারডামভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ফ্রি প্রেস আনলিমিটেড তাকে ফ্রি প্রেস অ্যাওয়ার্ড ২০২১ প্রদান করে। এতে বলা হয়, বাংলাদেশে কারোনাকালে স্বাস্থ্য খাতের অনিয়ম তুলে ধরতে গিয়ে নিগ্রহ-নির্যাতন ও মামলার শিকার হয়েছেন রোজিনা।
মেহেরুন্নেসা আবারও পত্রিকাটা সামনের দিকে ঠেলে রাখলেন। মনে মনে বললেন, সবই তো ঠিক লিখেছে। ভুল তো কিছু দেখি না। তাহলে দুর্নীতি করলটা কে? মন্ত্রীর অনুমোদন ছাড়া কোনো বিলই তো পাস হওয়ার কথা না! উনি বিলে সই করলে দেখেশুনে করবেন না! অন্যের ওপর দায় চাপালে চলবে! বিলে যার যার সই থাকবে তারা প্রত্যেকে ফাঁসবে।
মেহেরুন্নেসা আবার পত্রিকাটা হাতে নিলেন। ততক্ষণে মন্ত্রীর ঘুম ভেঙেছে। তিনি বাথরুমে গেলেন। কিছুক্ষণ পর ফিরে এসে এক গ্লাস পানি পান করে বিছানার পাশে রাখা সোফায় হেলান দিয়ে বসলেন। তার অবস্থা দেখে মনে হচ্ছে ভালো ঘুম হয়নি। তিনি কিছুক্ষণ দুই হাতের তালু দিয়ে চোখ ডলাডলি করলেন। তার পর আড়চোখে মেহেরুন্নেসার দিকে তাকালেন। তার চেহারায় মলিন ভাব দেখে বললেন, কী হয়েছে?
মেহেরুন্নেসা প্রথম আলো তার দিকে ছুড়ে দিয়ে বললেন, এটা দেখ।
প্রথম আলো দেখেই মন্ত্রীর মেজাজ বিগড়ে যায়। তিনি বিরক্তির সঙ্গে বললেন, এটায় আবার কী লিখেছে?
একবার খুলে দেখই না! তোমাদের সেই রোজিনা আন্তর্জাতিক পুরস্কার পেয়েছে।
তাই নাকি! কী কারণে পুরস্কার পেল?
পড়ে দেখ।
তুমি পড়েছ না?
পড়েছি।
তাহলে তুমিই বলো!
তোমাদের স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অনিয়মের ওপর রিপোর্ট করে জেল-জুলুমের শিকার হয়েছে।
মেহেরুন্নেসার কথা শুনে মেজাজ একেবারেই বিগড়ে গেল। তিনি বসা থেকে উঠতে উঠতে বললেন, এসব নাটক; বুঝছ? নাটক ছাড়া আর কিছু না। ওরা এগুলো ম্যানেজ করছে। আন্তর্জাতিক অনেক সংগঠন আছে; টাকা দিলেই পুরস্কার মেলে। বুঝতে পারছ?
মন্ত্রী আর দাঁড়ালেন না। তিনি বাথরুমে যাওয়ার ভান করে মেহেরুন্নেসার কাছ থেকে বিদায় নিলেন।
মেহেরুন্নেসা মলিন মুখখানা আরও মলিন হয়ে গেল। তিনি মন্ত্রীর চলে যাওয়া দেখলেন। তার পর তার দৃষ্টি স্থির হয়ে গেল। তিনি কাকে বিশ্বাস করবেন? নিজের স্বামীকে নাকি পত্রিকাটিকে? নিজের সঙ্গে নিজে বোঝাপড়া করেন। কোনো হিসাব মেলাতে পারেন না তিনি।
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,
পর্ব-২৭ পর্ব-২৮ পর্ব-২৯, পর্ব-৩০,পর্ব -৩১, পর্ব-৩২, পর্ব-৩৩,পর্ব-৩৪