সপ্তচত্বারিংশ পর্ব
ব্যবসায়ী লোকটি চলে যাওয়ার পর তিনি আরও কিছুক্ষণ বসে রইলেন। তিনি কিছুই আর ভাবতে পারছেন না। এই মুহূর্তে কাকে বলবেন? কে এগিয়ে আসবে আসন্ন বিপদ থেকে তাকে উদ্ধার করতে? মাথাটা একেবারে ফাঁকা হয়ে আছে। ঘুরেফিরে ওই এক চিন্তা; কীভাবে পত্রিকা চলবে, কোথা থেকে এর ফান্ড আসবে? কে বলবে, আমি এটাকে নিজের কিংবা ব্যবসায়িক স্বার্থে ব্যবহার করব না? কে বলবে, আমি পত্রিকাটিকে একটা পেশাদার হাউস হিসেবে গড়ে তুলতে চাই? সেজন্য সম্পাদককে যত ধরনের সহায়তা করা দরকার তা করব। কে বলবে, বিনিয়োগকারী হিসেবে আমার ভূমিকা হবে ধ্রুব তারার মতো। যা আলো দেবে কিন্তু উত্তাপ দেবে না। এমন মানুষ কোথায় পাব?
কথাগুলো আসিফ আহমেদের চিৎকার দিয়ে বলতে ইচ্ছা করছে। কিন্তু ইচ্ছা করলেই কি আর সব কিছু করা যায়! কখনো কখনো নিজেকেই নিজের রাশ টেনে ধরতে হয়। নিজেকে থামাতে হয়। তবে তিনি হাল ছাড়তে রাজি নন। তিনি শেষ দেখতে চান। নিশ্চয়ই কোথাও না কোথাও আলো আছে। আলো না থাকলেও আলো আসবে। আসতেই হবে। সবকিছু নিঃশেষ হয়ে যাওয়ার পরেও যে ঘুরে দাঁড়াতে পারে, সফলতা তারই আসে। ঘাত-প্রতিঘাত ছাড়া কি জীবনে কখনো সফল হওয়া যায়! জীবনে যদি ব্যর্থতাই না থাকল তাহলে সফলতার মর্ম বুঝব কীভাবে?
আসিফ আহমেদের নেলসন ম্যান্ডেলার কথা মনে পড়ে। তিনি তার আত্মজীবনী পড়ে ব্যাপকভাবে উদ্দীপ্ত হয়েছেন; অনুপ্রেরণা পেয়েছেন। ম্যান্ডেলা আফ্রিকার মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য দীর্ঘ সাতাশ বছর জেল খেটেছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব বাঙালি জাতির অধিকার আদায়ের জন্য তেরো বছর জেল খেটেছেন। কোনো মানুষ মানুষের অধিকার আদায়ের জন্য যদি এত ত্যাগ স্বীকার করতে পারেন, তাহলে আমি আসিফ আহমেদ কেন পারব না একটা পত্রিকা দাঁড় করাতে! আমাকে পারতেই হবে। অশুভ শক্তি যতই চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র করুক; আমি যদি নীতিতে অটল থাকি, আমার যদি সততা আর নিষ্ঠা থাকে তাহলে সফল আমি হবই।
ইস্পাতকঠিন মনোবল নিয়ে আসিফ আহমেদ উঠে দাঁড়ালেন। বীরের গতিতে অফিসের উদ্দেশে হাঁটতে শুরু করলেন।
দিলরুবা খান দরজার সামনে দাঁড়িয়ে আছেন। বৈরম খান ফোনে কথা বলছেন দেখে ভেতরে ঢুকছেন না। বৈরম খান তাকে দেখেও কথার মনোযোগ হারাবে বলে কিছু বলেননি। বলা শেষ করে হাসি হাসি মুখ করে দিলরুবা খানের দিকে তাকালেন তিনি। অনেক দিন পর দিলরুবা খান স্বামীর হাসিমুখ দেখলেন। পায়ে পায়ে তিনি তার কাছে এগিয়ে গেলেন। উচ্ছ্বাসভরা কণ্ঠে বললেন, কতদিন পর তোমার হাসিমুখ দেখলাম! কোনো সুখবর মনে হচ্ছে!
বসো বলছি।
দিলরুবা খান বৈরম খানের মুখোমুখি সোফায় বসলেন। বৈরম খান তাকে উদ্দেশ করে বললেন, তোমার ছেলের জন্য দুশ্চিন্তা করতে করতে কত রাত যে নির্ঘুম কাটিয়েছি! আজ মনে হয় একটু শান্তিতে ঘুমাতে পারব।
তাই! কি সুখবর বলো না!
এতক্ষণ আইজি সাহেবের সঙ্গে কথা বললাম।
কী বললেন উনি?
শোনোই না! উনি বললেন, ভাই আপনি এত চিন্তা করবেন না তো! আমি তো আগেও বলেছি; আপনার ছেলের দায়িত্ব আমি নিয়েছি। ওর বিষয় নিয়ে আপনি চিন্তা করবেন না। আমি দেখব। আমি বললাম, তাহলে যে বিদেশে যেতে বাধা দেওয়া হলো? উনি বললেন, ওটা একটা আইওয়াশ! আপনি বুঝতে পারছেন না। এমন একটা পরিস্থিতির সৃষ্টি করছি, মানুষ যাতে ভাবে, তদন্তের স্বার্থে তাকে বিদেশে যেতে দেওয়া হচ্ছে না। ধরুন ও বিদেশে গেল! তারপর কী হবে? পত্রিকায় রিপোর্ট হবে। তখন আমরা কী জবাব দেব? প্লিজ বোঝার চেষ্টা করেন! ওকে তো এখনই কিছুই বলা হয়নি। কোনো জিজ্ঞাসাবাদও করা হয়নি! এর পরও যদি আপনি এত দুশ্চিন্তা করেন তাহলে আমি বুঝব আপনি আমাকে আস্থায় নিতে পারেননি।
আমি বললাম, আসলে আমরা একটু ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম। বিদেশে যেতে বাধা! তার মানে ভেতরে ভেতরে আবার আমার ছেলের বিরুদ্ধে নতুন কোনো চার্জ গঠন হচ্ছে কিনা?
আইজি সাহেব তখন কী বললেন? দিলরুবা খান জানতে চাইলেন।
উনি বললেন, আমার ওপর আস্থা থাকলে চুপচাপ থাকেন। নিশ্চিন্তে ঘুমান। নতুন করে আর কী হবে? যা করে দিয়েছি, এখন আর নতুন করে কিছু করা সম্ভব না।
দিলরুবা খান স্বস্তির নিঃশ্বাস ছেড়ে বললেন, আল্লাহ তুমিই রক্ষা করার মালিক। তুমি ছেলেটাকে একটু জানাবা? চল, আমরা দুজনেই ওর বাসায় যাই। ও যে কী অবস্থায় আছে!
আমি ওই দিন ওকে খুব করে বলেছি। ওর ছেলের সামনেই বলেছি। ছেলেটাকে খুব বিমর্ষ দেখাচ্ছিল। এক ঘটনায় সব ওলট-পালট হয়ে গেল! সবকিছু এত চমৎকারভাবে চলছিল...
দিলরুবা খানের দুই চোখের কোটরে পানি জমে। তিনি কথা বলতে গিয়েও থেমে গেলেন। তিনি আঁচল দিয়ে চোখ মুছলেন। বৈরম খান আবেগের দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালেন। তার পর বললেন, তুমি কাঁদছ?
দিলরুবা খান এবার আর কান্না আটকাতে পারলেন না। তিনি হু হু করে কেঁদে উঠলেন। কাঁদতে কাঁদতেই বললেন, আমাদের খোদাতায়ালা এত কষ্ট কেন দিচ্ছে? আর যে সহ্য করতে পারছি না!
চলবে...
আগের পর্ব পড়তে ক্লিক করুন...
পর্ব-১, পর্ব-২, পর্ব-৩, পর্ব-৪, পর্ব-৫, পর্ব-৬, পর্ব-৭, পর্ব-৮, পর্ব-৯, পর্ব-১০, পর্ব-১১, পর্ব-১২, পর্ব-১৩, পর্ব-১৪, পর্ব-১৫, পর্ব-১৬, পর্ব-১৭, পর্ব-১৮, পর্ব-১৯, পর্ব-২০, পর্ব-২১, পর্ব-২২, পর্ব-২৩, পর্ব-২৪, পর্ব-২৫, পর্ব-২৬,
পর্ব-২৭ পর্ব-২৮ পর্ব-২৯, পর্ব-৩০,পর্ব-৩১, পর্ব-৩২, পর্ব-৩৩,পর্ব-৩৪, পর্ব-৩৫, পর্ব-৩৬, পর্ব-৩৭, পর্ব-৩৮, পর্ব-৩৯, পর্ব-৪০, পর্ব-৪১, পর্ব-৪২, পর্ব-৪৩,পর্ব-৪৪, পর্ব-৪৫, পর্ব-৪৬,